বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র অনুমোদন নিতে হবে। বোর্ডের অনুমোদনের আগে গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর করার আইনগত ক্ষমতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে কোনো শিক্ষককে শাস্তি দেওয়ার আগে যথাযথভাবে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া এবং বিধি মেনে তদন্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন আদালত। মৌখিক বা মুঠোফোনে নির্দেশ পেয়ে তড়িঘড়ি তদন্ত কমিটি গঠন করে শিক্ষককে বরখাস্ত করা আইনগত কর্তৃত্বের বাইরে এবং বেআইনি বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘মোহা. আখতারুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলার রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ৭ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের বেঞ্চ রায় দেন। গতকাল রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।
মামলাটিতে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাঁকে বকেয়া বেতন-ভাতা ও অবসরকালীন সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন আদালত।
যেভাবে শুরু
২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগম গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আবুল মনসুর জাকিয়া বেগমের বাড়িতে যান। প্রথমে তাঁর মেয়েকে একটি বই ফেরত দেওয়ার কথা বলে সেখানে গেলেও পরে আবার ফিরে এসে তাঁর ছোট মেয়ের পাশে বসেন এবং শিশুটির মাথা ও হাতে স্পর্শ করেন বলে অভিযোগ করা হয়। তৃতীয়বারও তিনি বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় ১৭ নভেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ওই নোটিশে ঘটনার তারিখ ৭ নভেম্বর উল্লেখ করা হয়েছিল এবং তিন দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
আবুল মনসুর পরদিন জবাব দেন। বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও তাঁর বিরুদ্ধে আনা অসৎ উদ্দেশ্য বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গভর্নিং বডি ২৯ নভেম্বর পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্নসংবলিত দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও অভিযোগ অস্বীকার করেন শিক্ষক।
এরপরই শুরু হয় মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গভর্নিং বডির সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা মুঠোফোনের নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। মাত্র ছয় দিনের মধ্যে ওই কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
পরে সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর দেখানো হয়।
বোর্ডে গিয়ে বদলে যায় সিদ্ধান্ত
বরখাস্তের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি তা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় কমিটি গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত অনুমোদন না করে তা নামঞ্জুর করে।
একই সঙ্গে আবুল মনসুরকে তাঁর পদে পুনর্বহাল এবং বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। ২৮ মে একটি স্মারকের মাধ্যমে কলেজ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়।
পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করলেও শিক্ষা বোর্ড জানায়, আপিল ও সালিশ কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনগত বিধান নেই।
এরপর বোর্ডের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামান। রিটের পর আদালত রুল জারি করেন এবং শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৭ জুলাই হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন এবং আগের স্থগিতাদেশও বাতিল করেন।
আদালত বলেন, আপিল ও সালিশ কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায় না। বোর্ডের অনুমোদনের আগেই গচিহাটা কলেজ কর্তৃপক্ষ বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে আইনগত এখতিয়ার অতিক্রম করেছে।
শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছেন আদালত। কারণ দর্শানোর পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়ে কিংবা শুধু মৌখিক বা মুঠোফোনের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া আইনসম্মত নয় বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলাটি চলমান থাকা অবস্থায় আবুল মনসুর অবসরের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাঁকে এখন আর আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলেও রায়ে উল্লেখ করেন আদালত।
তবে বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসরে যাওয়ার তারিখ পর্যন্ত সময়ের বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রাপ্য পেনশন সুবিধা থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন না। এসব পাওনা পরিশোধের জন্য শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এই রায়ের মধ্য দিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বরখাস্তের ক্ষেত্রে শুধু কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত নয়, নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া এবং শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদনের গুরুত্ব আবারও স্পষ্ট হলো।

