পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিদেশি নাগরিকত্ব, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং তাদের শপথ গ্রহণের সাংবিধানিক বৈধতা যাচাইয়ের দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এই নোটিশ পাঠানো হয়।
নোটিশ প্রেরণকারী আইনজীবী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদনসহ আইনি প্রতিকার চাইবেন।
নোটিশে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ও তৃতীয় তপশিলের আলোকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগ, যোগ্যতা, নাগরিকত্ব, আনুগত্য এবং শপথের বিষয়গুলো সাংবিধানিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক ও পঁচিশ বছর বয়সী যেকোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন। তবে কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে বা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা থাকার ক্ষেত্রে অযোগ্যতার প্রশ্ন উঠতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক কোনো ব্যক্তি পরবর্তীতে বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করে থাকলে, তা পরিত্যাগের পর তার সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে সংবিধানে পৃথক বিধান রয়েছে বলেও নোটিশে স্বীকার করা হয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির নাগরিকত্বের সামগ্রিক ইতিহাস এবং বর্তমান আইনগত অবস্থান খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া নোটিশে বলা হয়েছে, সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী তৃতীয় তপশিলে উল্লেখিত পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব গ্রহণের আগে নির্ধারিত শপথ নিতে হয়, যেখানে বাংলাদেশের প্রতি সত্যিকার বিশ্বাস ও আনুগত্য এবং সংবিধান রক্ষার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন উল্লেখ করে নোটিশে তার বিষয়ে একাধিক প্রশ্ন যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে—তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক কি না, অতীতে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন কি না, বিদেশি পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা বর্তমানে করছেন কি না, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন কি না এবং বিদেশি নাগরিকত্ব থেকে থাকলে তা কবে পরিত্যাগ করেছেন। একইভাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্ব এবং কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি সম্ভাব্য আনুগত্যের বিষয়টিও একই মানদণ্ডে যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই মন্ত্রীর নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট, অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য এবং নাগরিকত্ব গ্রহণ বা পরিত্যাগের প্রাসঙ্গিক নথিপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি তাদের নিয়োগ ও দায়িত্ব গ্রহণ প্রক্রিয়া সংবিধানের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ ও তপশিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নির্ধারণেরও দাবি জানানো হয়েছে। কোনো সাংবিধানিক অযোগ্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও নোটিশে বলা হয়েছে। অন্যদিকে যদি কোনো অযোগ্যতা প্রমাণিত না হয়, তাহলে তাদের নিয়োগ ও দায়িত্বে বহাল থাকার সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি স্পষ্টভাবে জানানোরও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি কোনো চূড়ান্ত অভিযোগ বা সিদ্ধান্ত নয়, বরং নাগরিকত্ব, বিদেশি আনুগত্য ও সাংবিধানিক যোগ্যতা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টির সমাধান না হলে বা সাংবিধানিক প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে গেলে সংবিধান ও প্রচলিত আইনে থাকা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপযুক্ত সাংবিধানিক বা বিচারিক ফোরামে যাওয়ার কথাও নোটিশে জানিয়ে রাখা হয়েছে।
এই আইনি পদক্ষেপ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব ও আনুগত্য প্রশ্নে দেশে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের জবাব দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই বিতর্কের পরবর্তী গতিপথ।

