মজুতদারির অভিযোগে জব্দ করা পচনশীল খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন থানায় ফেলে রেখে নষ্ট করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আলামত হিসেবে প্রমাণের জন্য যতটুকু খাদ্যশস্য প্রয়োজন, শুধু ততটুকু নমুনা সংরক্ষণ করতে হবে। অবশিষ্ট খাদ্যশস্য দ্রুত প্রকাশ্য নিলাম বা আইনসম্মত উপায়ে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
দীর্ঘদিন থানায় পড়ে থাকা ২৫ টন জব্দ করা চালের মালিকানা নিয়ে নিম্ন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে করা ফৌজদারি রিভিশনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ নির্দেশনা দেন।
‘মো. শিবলু হোসেন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় গত ১৯ আগস্ট বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। পরে রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মো. খায়রুল আলম।
আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মির্জা আল মাহমুদ ও মো. মাসুদুল আলম দোহা।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মো. জাহিদুল ইসলামের বাড়ি থেকে অবৈধভাবে মজুত করা ২৫ হাজার কেজি বা ২৫ মেট্রিক টন কাটারি আতপ চাল উদ্ধার করা হয়। ৫০০ বস্তায় থাকা ওই চালের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ১৫ লাখ টাকা।
এর পরদিন, ৪ জুলাই বদলগাছী থানায় ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ৩(ঘ)/৪ ধারায় মো. শিবলু হোসেন ও মো. জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে মামলাটি বিচারার্থে নওগাঁর তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়।
মামলার তদন্ত চলাকালে শিবলু হোসেন জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক দাবি করে তা নিজের জিম্মায় নেওয়ার আবেদন করেন। তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে শিবলু হোসেনকে জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে এরপরও ২২ জুলাই ম্যাজিস্ট্রেট জব্দ করা চালের জিম্মা চেয়ে করা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে নওগাঁর সেশনস জজ আদালতে ফৌজদারি রিভিশন করা হলেও তা খারিজ হয়ে যায়।
এরপর ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর আবারও জব্দ করা চালের জিম্মা চেয়ে বিচারিক আদালতে আবেদন করেন শিবলু হোসেন। একই দিন সেই আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরে ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন করেন তিনি।
আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরবর্তী সময়ে গত ১৯ আগস্ট আদালত রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, জব্দ করা চাল দীর্ঘদিন পুলিশ হেফাজতে থাকায় তা নষ্ট হয়ে মানুষের ভোগের অনুপযোগী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এভাবে চাল পুলিশ হেফাজতে রেখে কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
আদালত ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ১১ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করেন।
আইনের ১১(১) ধারার বিধান উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, এ আইনের অধীনে জব্দ করা খাদ্যশস্য পচনশীল বা অপচনশীল—যেটিই হোক, আদালতের দায়িত্ব হলো আলামত হিসেবে প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ নমুনা সংরক্ষণ করা। এরপর অবশিষ্ট খাদ্যশস্য দ্রুত প্রকাশ্য নিলাম অথবা আইনসম্মত উপায়ে নিষ্পত্তি করতে হবে।
আদালত আরও বলেন, আইনের ১১(৩) ধারায় বিচার শেষে আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ বা জামানত সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হলে প্রকৃত মালিককে তা ফেরত দিতে হবে।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই জব্দ করা চালগুলো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ ছাড়াই দীর্ঘ সময় থানার হেফাজতে রয়েছে। এভাবে দীর্ঘদিন রাখলে চাল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করেন।
এ কারণে জব্দ করা চালের পুরোটা থানায় রেখে দেওয়ার পরিবর্তে প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অবশিষ্ট চাল আবেদনকারী মো. শিবলু হোসেনের কাছে ১৫ লাখ টাকার বন্ড বা জামানত সম্পাদনের শর্তে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ে বলা হয়, বিচারিক কার্যক্রম শেষে শিবলু হোসেনের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে ১৫ লাখ টাকার বন্ডের অর্থ বাজেয়াপ্ত হয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হলে ওই বন্ড বা জামানত তার অনুকূলে বাতিল বলে গণ্য হবে।
হাইকোর্টের এ রায়ে মূলত স্পষ্ট হয়েছে, কোনো মামলার আলামত সংরক্ষণের নামে পচনশীল খাদ্যশস্য অনির্দিষ্টকাল থানায় ফেলে রেখে নষ্ট করার সুযোগ নেই। মামলার প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় অংশ সংরক্ষণ করে অবশিষ্ট খাদ্যশস্য আইন অনুযায়ী দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

