অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে বিচারিক নিলামে বিক্রি হওয়া স্থাবর সম্পত্তির মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নিলামে বিক্রি হওয়া স্থাবর সম্পত্তির ক্রেতাকে ‘পণ্যের নিলাম ক্রেতা’ হিসেবে গণ্য করে ভ্যাট আরোপের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত।
বিচারপতি সরদার রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১ সেপ্টেম্বর রুল ও সম্পূরক রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন। বৃহস্পতিবার আইনজীবী ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এই রায়ের ফলে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে ডিক্রি বাস্তবায়নের সময় বিচারিক নিলামে কেনা স্থাবর সম্পত্তির মূল্যমানের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকল না। একই সঙ্গে আদালত অধস্তন আইন বা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মূল আইনের বাইরে গিয়ে নতুন করদায় আরোপের সীমাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
২৪ কোটি টাকার সম্পত্তি কিনে ভ্যাটের মুখে নিলাম ক্রেতা
ঘটনার সূত্রপাত একটি ব্যাংকঋণ আদায়ের মামলাকে কেন্দ্র করে। একটি ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান কার্যকরী মূলধনের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ঢাকার অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। পরে ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য অর্থঋণ জারি মামলা করা হয় এবং অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(১) ধারার অধীনে বন্ধকী সম্পত্তিটি নিলামে তোলা হয়।
নিলামে আবেদনকারীরা সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ২৪ কোটি টাকায় সম্পত্তিটি কিনে নেন। তাদের দেওয়া দর অনুমোদনের পর তাঁরা সম্পূর্ণ নিলামমূল্য আদালতে জমা দেন। অর্থঋণ আদালত সেই অর্থ ও পাউন্ডেজ ফি গ্রহণের পর নিলামমূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং প্রযোজ্য স্ট্যাম্প শুল্ক জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
কিন্তু নিলাম ক্রেতাদের প্রশ্ন ছিল—আদালতের মাধ্যমে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়ায় বিক্রি হওয়া একটি স্থাবর সম্পত্তির ক্রেতার ওপর ভ্যাট আরোপের আইনগত ভিত্তি কোথায়?
এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় পরবর্তী আইনি লড়াই।
ব্যাংককে ছাড়, ক্রেতার ওপর ভ্যাট—আপত্তি সেখানেই
অর্থঋণ আদালতের ওই নির্দেশকে নিলাম ক্রেতা ও ডিক্রিদার ব্যাংক—উভয় পক্ষই চ্যালেঞ্জ করে। পরবর্তী সময়ে আগের কয়েকটি রায়ের আলোকে আদালত ডিক্রিধারী ব্যাংককে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দিলেও নিলাম ক্রেতাদের আবেদন গ্রহণ করেননি। তাঁদের নিলামমূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও স্ট্যাম্প শুল্ক জমা দেওয়ার নির্দেশ বহাল রাখা হয়।
এরপর নিলাম ক্রেতারা হাইকোর্টে রিট করেন।
গত ৮ এপ্রিল বিচারপতি আকরাম হোসেন চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে নিলাম ক্রেতাদের ওপর নিলামমূল্যের ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও স্ট্যাম্প শুল্ক জমা দেওয়ার নির্দেশ কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই নির্দেশের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়।
পরে রুল ও সম্পূরক রুলের শুনানি হয় বিচারপতি সরদার রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি জিয়াউল হকের বেঞ্চে।
নিলাম ক্রেতাদের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান এবং আইনজীবী ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব ও অ্যাডভোকেট সাজিদ হাসান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তানিম খান।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে হাইকোর্ট রুল ও সম্পূরক রুল যথাযথ ঘোষণা করেন।
‘পণ্যের নিলাম ক্রেতা’ বলা যাবে না স্থাবর সম্পত্তির ক্রেতাকে
রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্থাবর সম্পত্তির বিচারিক নিলামকে সাধারণ পণ্যের নিলামের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
হাইকোর্ট বলেছেন, নিলাম ক্রেতাদের নিলামমূল্যের ওপর উৎসে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে অর্থঋণ আদালত যে আদেশ দিয়েছিল, তা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূতভাবে দেওয়া হয়েছে এবং ওই আদেশের কোনো আইনগত কার্যকারিতা নেই।
শুধু অর্থঋণ আদালতের আদেশ নয়, সংশ্লিষ্ট এসআরওর সেই অংশও আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছেন, যেখানে স্থাবর সম্পত্তির ক্রেতাকে ‘পণ্যের নিলাম ক্রেতা’ অভিব্যক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এখানেই রায়ের আইনি তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি।
কারণ কর আরোপের ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা বা অধস্তন আইন দিয়ে মূল আইনের পরিধি বাড়ানো যায় কি না—এই প্রশ্নটি সরাসরি সামনে এসেছে।
সংসদীয় আইনের সীমা অতিক্রম করতে পারে না এসআরও
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় হলো কর আরোপের আইনগত ক্ষমতা। কোনো সম্পত্তির বিক্রয় বা হস্তান্তরকে সংসদ প্রণীত আইনের মাধ্যমে ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেওয়া থাকলে পরবর্তী সময়ে একটি এসআরও বা অন্য কোনো অর্পিত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সেই সম্পত্তির ওপর নতুন করে করের দায় সৃষ্টি করা যায় না।
অর্থাৎ, প্রশাসনিক বা অধস্তন কর্তৃপক্ষ মূল আইনের বাইরে গিয়ে করের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে না।
এটি শুধু নিলাম ক্রেতাদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তির বিষয় নয়; কর আরোপের ক্ষেত্রে মূল আইন বনাম অধস্তন আইনের ক্ষমতার সীমা নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করল এই রায়।
অর্থঋণ আদালতের নিলামে এর প্রভাব কী
ব্যাংকঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে বন্ধকী সম্পত্তি নিলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে কোনো সম্পত্তি বিক্রি হলে সেই সম্পত্তি কিনতে আগ্রহী ব্যক্তির জন্য নিলামমূল্যের সঙ্গে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাটের বোঝা যুক্ত হওয়া নিলাম প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ২৪ কোটি টাকার মতো বড় মূল্যের সম্পত্তির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ফলে নিলামমূল্যের বাইরে এমন একটি অতিরিক্ত দায় ক্রেতার ওপর চাপলে নিলামে অংশগ্রহণের আগ্রহ এবং সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে।
হাইকোর্টের এই রায় সেই অতিরিক্ত করদায়ের প্রশ্নে নিলাম ক্রেতাদের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অবস্থান তৈরি করেছে।
তবে রায়ের পূর্ণাঙ্গ লিখিত বক্তব্যে আদালত কোন কোন আইন, এসআরও ও পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তা আরও বিস্তারিতভাবে স্পষ্ট হবে। সেই ব্যাখ্যাই ভবিষ্যতে অর্থঋণ আদালতের নিলাম এবং স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রায়ের প্রয়োগের পরিধি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

