রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় দূরবর্তী আদালতে যাতায়াতের ঝুঁকি ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি শরণার্থী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াতে অনুমতি, চেকপোস্টে বিলম্ব এবং নিরাপত্তাজনিত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে যাদের আদালতে সরাসরি হাজির করা কঠিন, তাদের জন্য এ ব্যবস্থা কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নয়, দেশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার বিচারপ্রার্থীদেরও ভার্চুয়াল শুনানির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থা কার্যকর করতে নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো, বিচারক-আইনজীবী ও আদালত কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিচারিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২ (পশ্চিম)-এ ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদেমুল কায়েস, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মঞ্জুরুল হোসেন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা অভিজিৎ চৌধুরী এর উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা বিচারপ্রার্থী ছাড়াও ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অপহরণের একটি মামলায় নারী ও শিশু আদালতের ভার্চুয়াল শুনানির মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের সূচনা হয়। এর লক্ষ্য কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলের রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিচারিক সেবা আরও সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আদালতে যেতে অনেক সময় প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। এর সঙ্গে রয়েছে ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াতের অনুমতিসংক্রান্ত জটিলতা, বিভিন্ন চেকপোস্টে অপেক্ষা এবং নিরাপত্তাঝুঁকি। ফলে কোনো মামলায় অভিযুক্ত, ভুক্তভোগী বা সাক্ষীকে আদালতে সশরীরে হাজির করতে গেলে সময় ও জনবল—দুই দিক থেকেই বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
বিশেষ করে মাদক, অস্ত্র, হত্যা বা অন্যান্য গুরুতর মামলায় অভিযুক্তদের ক্যাম্প থেকে আদালতে নেওয়া এবং আবার ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। একইভাবে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের বারবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আদালতে উপস্থিত হতে হলে তাদের ওপরও মানসিক ও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এই বাস্তবতায় ভার্চুয়াল শুনানি আদালতে উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা কিছু ক্ষেত্রে কমিয়ে আনতে পারে। তবে ভার্চুয়াল পদ্ধতি চালু হলেই বিচারপ্রক্রিয়ার সব সমস্যা দূর হবে—এমনটি মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, সংযোগের নিরাপত্তা, সাক্ষীর স্বাধীনভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং বিচারিক তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ভার্চুয়াল শুনানি কার্যকর করতে বিচারক, আইনজীবী ও আদালতের কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিচারিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা জরুরি।
তিনি জানান, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় দেশের আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে বিচারপ্রক্রিয়া সচল রাখতে সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়। এ জন্য সরকার তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আইনগত কাঠামো তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে ওই আইনের ৫ ধারার অধীনে সুপ্রিম কোর্ট প্র্যাকটিস ডিরেকশন জারি করে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই এ বিষয়ে নতুন প্র্যাকটিস ডিরেকশন জারি করা হয়েছে।
কীভাবে হবে ভার্চুয়াল শুনানি
এ ব্যবস্থায় সাধারণত একটি ‘রিমোট পয়েন্ট’ নির্ধারণ করা হয়। সেটি হতে পারে লিগ্যাল এইড অফিস, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নির্দিষ্ট কোনো কার্যালয় কিংবা উপযুক্ত অন্য কোনো স্থান। ভুক্তভোগী, সাক্ষী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত থাকবেন। অন্যদিকে বিচারক আদালতকক্ষে অবস্থান করে অডিও-ভিডিও প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের বক্তব্য বা সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন।
এ ব্যবস্থায় আদালতের বিচারক এবং রিমোট পয়েন্টে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরস্পরকে দেখতে ও শুনতে পারবেন। প্রয়োজনে দেশের বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তিকেও দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
ফলে বিচারপ্রার্থীর শারীরিক উপস্থিতি সব ক্ষেত্রে অপরিহার্য না করে প্রয়োজন ও মামলার প্রকৃতি অনুযায়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ
রোহিঙ্গাদের জন্য ভার্চুয়াল আদালত চালুর ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধার বিষয়টি নয়, তাদের বিচারিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের আইনি পরিভাষায় সাধারণত ‘শরণার্থী’ না বলে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থানকালে তারা কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে দেশের বিচারব্যবস্থার অধীনেই তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন।
তবে এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিচারপ্রক্রিয়ায় তাদের আইনি অধিকার কতটা এবং কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে জামিন, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ, সাক্ষ্য প্রদান এবং আদালতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলো ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় কীভাবে পরিচালিত হবে, তার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন।
এ কারণে একটি মানসম্মত পরিচালনাপদ্ধতি বা এসওপি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন নির্দেশনা থাকলে রোহিঙ্গা বিচারপ্রার্থীদের অধিকার, আদালতের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
শুধু রোহিঙ্গা নয়, সুবিধা পাবে দুর্গম এলাকার মানুষও
ভার্চুয়াল আদালতের পরিধি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের যেসব অঞ্চলের মানুষ ভৌগোলিক দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে আদালতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন, তাদের জন্যও এ ব্যবস্থা কাজে লাগতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, বান্দরবানের আলীকদমের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা নদীভাঙনকবলিত চরাঞ্চলের মানুষকে দূরবর্তী আদালতে যাতায়াতের কষ্ট ও ব্যয় থেকে অনেকাংশে মুক্ত করা সম্ভব। এর ফলে ভার্চুয়াল আদালত বিচারিক সেবাকে আরও সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত করার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য আদালতের প্রযুক্তিগত বিকল্প তৈরি নয়; বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ভৌগোলিক দূরত্ব ও নিরাপত্তাজনিত বাধা কমানোর একটি পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তির পাশাপাশি ন্যায়বিচারের মৌলিক নিশ্চয়তা, পক্ষগুলোর অধিকার এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কতটা বজায় রাখা যায় তার ওপর।

