অবসর বা পদত্যাগের পর সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতিদের সাধারণ পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে গোয়েন্দা যাচাইয়ের শর্তকে অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন বলেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্র যাদের পরিচয় ও মর্যাদা যাচাই করে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দিয়েছে, অবসরের পর সাধারণ পাসপোর্টের জন্য তাঁদের আবার গোয়েন্দা ভেরিফিকেশনের মুখোমুখি করার যৌক্তিকতা নেই।
আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর পাসপোর্ট-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে করা এক রিটের রায়ে বৃহস্পতিবার এ পর্যবেক্ষণ দেন বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। একই দিন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
রায়ে আদালত মোহাম্মদ ইমান আলীসহ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক এবং তাঁদের স্ত্রীদের কোনো অতিরিক্ত গোয়েন্দা যাচাই ছাড়াই সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু ও হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন।
যে সিদ্ধান্তে জটিলতার শুরু
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও তাঁদের স্ত্রীদের ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুযায়ী কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিচারপতির দায়িত্ব শেষ হলে সেই পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হয়।
রিটে বলা হয়, আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করলে আলাদা কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট একটি স্মারক জারি করে নতুন শর্ত আরোপ করে। এতে কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণকারী ব্যক্তিদের সাধারণ পাসপোর্ট দেওয়ার আগে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সন্তোষজনক প্রতিবেদন নেওয়ার কথা বলা হয়।
এই সিদ্ধান্তের পরই সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর পাসপোর্ট নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
পাসপোর্ট না পাওয়ায় বিদেশযাত্রায় বাধা
মোহাম্মদ ইমান আলী ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু গোয়েন্দা ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে তাঁকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়নি।
এর ফলে তিনি বিদেশ ভ্রমণ করতে পারেননি। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের অনুমতিক্রমে হাইকোর্ট বিভাগের প্রোটোকল অফিসার মো. রোমান ভূঁইয়া প্রশাসনিক এই বাধাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন। ওই রিটের পর আদালত রুল জারি করেন এবং শুনানি শেষে তা নিষ্পত্তি করে রায় দেন।
আদালতের যুক্তির জায়গাটি কোথায়
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় শুধু একজন সাবেক বিচারপতির পাসপোর্ট পাওয়া না-পাওয়া নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতাও জড়িত।
একজন বিচারপতি যখন দায়িত্বে থাকেন, তখন রাষ্ট্র তাঁর পরিচয়, পদমর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত থাকে। সেই অবস্থায় তাঁকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়া হয়। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর একই ব্যক্তির সাধারণ পাসপোর্টের আবেদনকে নতুন করে নিরাপত্তা যাচাইয়ের সঙ্গে যুক্ত করার যৌক্তিক ভিত্তি কী—মূলত সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে এই মামলায়।
আদালতের মতে, অবসরের পর সাধারণ নাগরিক হিসেবে পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সাবেক বিচারপতিদের আলাদা করে গোয়েন্দা যাচাইয়ের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন।
রায়ের ফলে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমতা থাকাই যথেষ্ট নয়, সেই ক্ষমতার প্রয়োগের যৌক্তিক ভিত্তিও থাকতে হবে—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতি সামনে এসেছে।
শুধু বিচারপতি নন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেরও প্রশ্ন
পাসপোর্ট রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিককে বিদেশ ভ্রমণের জন্য দেওয়া একটি সরকারি নথি। ফলে এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় জড়িত থাকতে পারে। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কোনো শ্রেণির নাগরিকের জন্য অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা হলে সেই শর্তের আইনগত ভিত্তি ও প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই মামলায় হাইকোর্ট সেই জায়গাটিই পরীক্ষা করেছেন। বিশেষ মর্যাদার কারণে সাবেক বিচারপতিদের সাধারণ পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে সব ধরনের যাচাই থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে—বিষয়টি আদালতের রায়ের সরল অর্থ নয়। বরং আদালতের পর্যবেক্ষণ হলো, দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও যাচাইকৃত সাবেক বিচারপতিদের সাধারণ পাসপোর্টের ক্ষেত্রে নতুন করে গোয়েন্দা যাচাই বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নেই।
ফলে রায়টি শুধু সাবেক বিচারপতিদের পাসপোর্ট পাওয়ার পথ সহজ করার বিষয় নয়; প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আইনগত ভিত্তি, যৌক্তিকতা ও সমতার নীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

