একটি কবিতা কতটা শক্তিশালী হতে পারে? এতটাই যে, তাকে ঘিরে হতে পারে আদালতের বিচার, গ্রেপ্তার হতে পারেন প্রকাশক, আর সেই মামলার রায় বদলে দিতে পারে গোটা একটি জাতির সাহিত্য-সংস্কৃতির গতিপথ। অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘হাওল’ কবিতা ঠিক এমনই এক ইতিহাসের নাম।
যে রাতে শুরু হয়েছিল গল্পটা
১৯৫৫ সালের ৭ অক্টোবর। সান ফ্রান্সিসকোর ছোট্ট এক আর্ট গ্যালারি, সিক্স গ্যালারি। মুষ্টিমেয় শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে তরুণ কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ প্রথমবারের মতো পড়ে শোনালেন তার নতুন লেখা কবিতা – ‘হাওল’। সেই মুহূর্তে কেউ কল্পনাও করেননি, এই কবিতাই একদিন মার্কিন সাহিত্যের সেন্সরশিপ-বিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠবে।
গিন্সবার্গ ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার প্রচলিত সামাজিক কাঠামো প্রত্যাখ্যানকারী এক সাহিত্য আন্দোলনের মুখ; যাকে পরে বলা হবে ‘বিট জেনারেশন’। তার কবিতায় মিশে ছিল ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, মাদকাসক্তির অভিজ্ঞতা আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ।
কীভাবে জন্ম নিল ‘হাওল’
কবিতাটির শুরু আসলে এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৫৫ সালের ৮ জুন গিন্সবার্গ লিখতে বসেন তার বন্ধু জোয়ান ভলমারকে নিয়ে দেখা একটি স্বপ্নের কথা মাথায় রেখে। ভলমার নিজেও ছিলেন বিট আন্দোলনের প্রথম দিককার একজন লেখক, ১৯৫১ সালে মেক্সিকোতে দুর্ঘটনাক্রমে তার মৃত্যু হয়। সেই লেখাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় তিন অংশের দীর্ঘ কবিতা ‘হাওল’-এ।
কবিতায় গিন্সবার্গ তার নিজের জীবনের অন্ধকার দিকগুলোও তুলে ধরেছিলেন। এর আগে চুরি করা মালামাল রাখার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তাকে আট মাস কাটাতে হয়েছিল একটি মানসিক হাসপাতালে। তার মা এবং জীবনসঙ্গী পিটার অরলভস্কিও দীর্ঘদিন মানসিক অসুস্থতায় ভুগেছিলেন – এসব অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট কবিতার শুরুর লাইনগুলোতেও।
তবে ‘হাওল’ শুধু ব্যক্তিগত যন্ত্রণার আখ্যান ছিল না। এতে ছিল ১৯৫০-এর দশকের রক্ষণশীল আমেরিকান সমাজব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা। কবিতায় ব্যবহৃত ‘মোলক’ প্রতীক -হিব্রু বাইবেলের এক কুখ্যাত দেবতার নাম থেকে নেওয়া যা গিন্সবার্গের কাছে হয়ে উঠেছিল পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন আর সামরিক-শিল্প কাঠামোর প্রতীক। কবিতার অনিয়মিত, জ্যাজধর্মী ছন্দ আর পরাবাস্তব চিত্রকল্প তাকে দিয়েছিল অনন্য এক রূপ।
বই যখন আসামির কাঠগড়ায়
১৯৫৬ সালে সান ফ্রান্সিসকোর সিটি লাইটস বুকস থেকে প্রকাশিত হয় ‘হাওল অ্যান্ড আদার পোয়েমস’। খরচ বাঁচাতে বইটি ছাপা হয়েছিল ইংল্যান্ডে, সেখান থেকেই আমদানি করা হতো যুক্তরাষ্ট্রে।
১৯৫৭ সালের মার্চে বিপত্তি বাধে। যুক্তরাজ্য থেকে আসা ৫২০ কপি বই মার্কিন কাস্টমস কর্মকর্তারা আটক করেন, অশ্লীলতার অভিযোগে। কয়েক মাস পর জুনে দুই পুলিশ সদস্য ছদ্মবেশে ক্রেতা সেজে দোকান থেকে একটি কপি কেনেন আর তার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় দোকানের মালিক লরেন্স ফেরলিংগেট্টি ও ব্যবস্থাপক শিগ মুরাওকে, অশ্লীল সাহিত্য বিক্রির অভিযোগে।
কবিতায় থাকা মাদকাসক্তি, মানসিক অসুস্থতা আর যৌনতার খোলামেলা বর্ণনা রক্ষণশীল সমাজে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। তখনকার আমেরিকা ছিল শীতল যুদ্ধের ছায়ায় ঢাকা—যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও সামাজিক রীতির বাইরে গেলেই নেমে আসত নানামুখী নিপীড়ন। এমন এক প্রেক্ষাপটেই কবিতাটি হয়ে ওঠে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
আদালতে লড়াই
১৯৫৭ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হয় বিচার। প্রসিকিউশনের দাবি ছিল কবিতাটির কোনো সামাজিক মূল্য নেই, বরং তা তরুণদের বিপথে চালিত করতে পারে, আর দোকান কর্তৃপক্ষের বই বিক্রির উদ্দেশ্যও ছিল অশ্লীল।
বিপরীতে আসামিপক্ষে দাঁড়ায় আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন। প্রধান আইনজীবী জেক এরলিখ আদালতে হাজির করেন নয়জন খ্যাতিমান সাহিত্য-সমালোচক ও অধ্যাপককে, যারা কবিতাটির সাহিত্যমূল্য প্রমাণে সাক্ষ্য দেন। গিন্সবার্গ নিজে তখন ছিলেন বিদেশে, তবে ফেরলিংগেট্টির প্রতি সংহতি জানিয়ে চিঠি পাঠান।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিচার শুরুর কিছুদিন আগেই মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘রথ বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ মামলায় এক নতুন রায় দেয়, যেখানে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে সাহিত্যকর্মের সুরক্ষাকে আরও স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই রায় ‘হাওল’ মামলার গতিপথ অনেকটাই নির্ধারণ করে দেয়।
৩ অক্টোবর, ১৯৫৭ সালে বিচারক ক্লেটন হর্ন যে রায় দেন, তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ – তিনি জানান, ‘হাওল’ অশ্লীল নয়, বরং এর ‘সামাজিক গুরুত্ব’ রয়েছে। তার যুক্তি ছিল, সাহিত্যকর্মকে বিচ্ছিন্ন শব্দ বা বাক্য ধরে নয়, সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে। *ভাষাকে যদি সবসময় নিরাপদ ও নিষ্প্রাণ ভদ্রতার সীমায় বেঁধে রাখতে হয়, তাহলে প্রকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে* – এমনটাই ছিল তার পর্যবেক্ষণের সারকথা।
যে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে
এই রায়ের প্রভাব শুধু একটি বইয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। মামলা-পরবর্তী সময়ে ‘হাওল’ বইয়ের কপি বিক্রি হয় লাখ লাখ। গিন্সবার্গ হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কণ্ঠস্বর, আর তার সহযাত্রী উইলিয়াম এস বারোজ ও জ্যাক কেরুয়াকের মতো লেখকরাও পান বিস্তৃত পাঠকগোষ্ঠী। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ফল অব আমেরিকা’ বইয়েও গিন্সবার্গ যুদ্ধবিরোধী ও কর্তৃত্ববিরোধী বিষয়ে সমানভাবে স্পষ্টবাদী ছিলেন।
সাহিত্য-সমালোচকদের মতে, ‘হাওল’-কে ঘিরে এই বিচার এতটা আলোচিত না হলে বিট আন্দোলন হয়তো কখনোই আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারত না। কিন্তু এর প্রভাব বিট আন্দোলনের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত হয়েছিল।
এই রায়ের সূত্র ধরেই পরবর্তী বছরগুলোয় আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পায় ডিএইচ লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ এবং হেনরি মিলারের ‘ট্রপিক অব ক্যানসার’-এর মতো বিতর্কিত রচনা। ১৯৬২ সালে প্রকাশকরা সাহস করে প্রকাশ করেন বারোজের ‘নেকেড লাঞ্চ’-এর মতো আরও দুঃসাহসী রচনা।
এমনকি হলিউডও এই রায়ের সুফল ভোগ করে। ‘সামাজিক গুরুত্ব’-এর যে আইনি মানদণ্ড তৈরি হয়েছিল, তা কাজে লাগিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতারা কঠোর ‘হেইস কোড’-এর বেড়াজাল এড়িয়ে অনেক বেশি সাহসী বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান।
পরিশেষে একটি কবিতা, একটি ছোট্ট বইয়ের দোকান আর একজন সাহসী প্রকাশকের বিরুদ্ধে আনা মামলা – শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক মাইলফলক। ‘হাওল’ প্রমাণ করেছিল, বিতর্কিত বা অস্বস্তিকর শিল্পকর্মও রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের ঊর্ধ্বে থাকার অধিকার রাখে যদি তার মধ্যে থাকে প্রকৃত সাহিত্যমূল্য। প্রায় সাত দশক পরেও এই মামলা মনে করিয়ে দেয়, শিল্প ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার লড়াই কখনো সহজ পথে আসে না।

