একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ও চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ার এই সময়ে সনাতনী অর্থনৈতিক চিন্তাধারাও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
শুধু মুনাফা অর্জন নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখন ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ব্যাংকের অর্থায়নকে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার আধুনিক ধারণাই হলো ‘গ্রিন ব্যাংকিং’ বা সবুজ ব্যাংকিং।
ব্যাংক সরাসরি কোনো পণ্য উৎপাদন করে না, কোনো কারখানার মতো ধোঁয়া নির্গমনও করে না। কিন্তু ব্যাংক কাকে ঋণ দিচ্ছে, কোন শিল্পে বিনিয়োগ করছে, কোন প্রযুক্তিকে উৎসাহ দিচ্ছে এবং কোন প্রকল্পকে পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে—এসব সিদ্ধান্তের ওপর দেশের উৎপাদন কাঠামোর ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে। ফলে গ্রিন ব্যাংকিং এখন কেবল করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; এটি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু সহনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশে গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় বেশ আগে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকের জন্য ‘গ্রিন ব্যাংকিং পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি ফ্রেমওয়ার্ক’ জারি করে। এতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা, ব্যাংকের নিজস্ব পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, অনলাইন ব্যাংকিং, পরিবেশবান্ধব পণ্য ও সেবা এবং সবুজ প্রকল্পে অর্থায়নের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে টেকসই অর্থায়নের বিস্তৃত কাঠামো তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
পরবর্তী সময়ে এই কাঠামো আরও বিস্তৃত হয়। ২০১৩ সালে গ্রিন ব্যাংকিং ও করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বিভাগ গঠিত হয় এবং ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই তা পুনর্গঠিত হয়ে ‘সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট’ বা টেকসই অর্থায়ন বিভাগে রূপ নেয়। এর লক্ষ্য ছিল সবুজ ব্যাংকিং, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা।
২০১৬ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই অর্থায়ন ইউনিট ও কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা এবং সবুজ অর্থায়নের পণ্যের তালিকা চালু হয়। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক টেকসই অর্থায়ন নীতি এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টেকসইতা রেটিংয়ের কাঠামো জারি করে। ২০২২ সালে সবুজ বন্ড অর্থায়ন নীতিমালা এবং ২০২৩ সালে টেকসই ও জলবায়ু-সম্পর্কিত আর্থিক তথ্য প্রকাশের কাঠামো প্রবর্তিত হয়। ২০২৫ সালে জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকাও জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে গ্রিন ব্যাংকিং এখন বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সবুজ ও টেকসই অর্থায়নের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি মিলিয়ে গ্রিন ফাইন্যান্সের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৭৬ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং টেকসই অর্থায়ন ছিল ৭৩ হাজার ২৯২ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
পরবর্তী অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে গ্রিন ফাইন্যান্স বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৯৮০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকগুলো দিয়েছে ৫ হাজার ৯৯০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো দিয়েছে ৯৮৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। একই সময়ে মোট টেকসই অর্থায়ন হয়েছে ৮৩ হাজার ৭৪৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা; এর মধ্যে ব্যাংকের অংশ ৮১ হাজার ১২৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ফাইন্যান্স কোম্পানির অংশ ২ হাজার ৬২১ কোটি ১২ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অক্টোবর–ডিসেম্বর ২০২৫ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের এই পরিসংখ্যানগুলো সরাসরি অর্থায়নের বিস্তৃতি তুলে ধরে।
বার্ষিক হিসাবেও প্রবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৫ সালের পুরো বছরে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি মিলিয়ে সবুজ অর্থায়ন হয়েছে ৩০ হাজার ৩৬৯ দশমিক ২৬ কোটি টাকা এবং টেকসই অর্থায়ন হয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৯৮২ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা। মোট মেয়াদি ঋণ বিতরণের তুলনায় সবুজ অর্থায়নের অংশ ছিল ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং টেকসই অর্থায়নের অংশ ছিল ৩৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—সবুজ অর্থায়ন ও টেকসই অর্থায়ন এক নয়। সবুজ অর্থায়ন মূলত পরিবেশ ও জলবায়ুসম্পর্কিত নির্দিষ্ট প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে টেকসই অর্থায়নের পরিসর আরও বিস্তৃত; এর মধ্যে পরিবেশের পাশাপাশি সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল অর্থায়ন, টেকসই কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত।
২০২৫ সালের জন্য সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৭ হাজার ৮২০ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা এবং টেকসই অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৬৩ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা। বছরের অর্জন অনুযায়ী সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রার ৪৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং টেকসই অর্থায়নের ৮২ দশমিক ৫৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। অর্থাৎ টেকসই অর্থায়নে অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও সরাসরি সবুজ অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও বড় অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে তাদের নিট ঋণ ও অগ্রিমের ভিত্তিতে ৫ শতাংশ গ্রিন ফাইন্যান্স এবং ৪০ শতাংশ সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর অভিনব উদ্যোগ। গ্রিন ব্যাংকিং এখন শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রম, গ্রাহকসেবা ও আর্থিক পণ্যের মধ্যেও পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন দেখা যাচ্ছে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ মেঘনা ব্যাংক পিএলসি। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ১০০ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড চালু করে। একই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘গ্রিন প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ড’ ও ‘উইমেন প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ড’ চালু করা হয়। ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব কার্ড তৈরিতে প্রচলিত কার্ডের তুলনায় শক্তি ব্যবহারে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হয়। এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু একটি ব্যাংকিং পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিপুলসংখ্যক প্লাস্টিক কার্ডের ব্যবহার ও পরিত্যক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে পুনর্ব্যবহৃত উপাদানের ব্যবহার ব্যাংকিং খাতের পরিবেশগত পদচিহ্ন কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কাগজবিহীন ও ডিজিটাল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, ই-স্টেটমেন্ট, ডিজিটাল লেনদেন, অনলাইন আবেদন ও ইলেকট্রনিক নথিপত্রের ব্যবহার ব্যাংকের কাগজ, মুদ্রণ ও পরিবহননির্ভরতা কমাতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক গ্রিন ব্যাংকিং কাঠামোতেই অনলাইন ব্যাংকিং ও অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ধরে নেওয়া যাবে না। তথ্যকেন্দ্র, সার্ভার, যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক বর্জ্যেরও পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোকে শুধু কাগজের ব্যবহার নয়, বিদ্যুৎ ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি; বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি ও সম্পদ দক্ষতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন, সবুজ ভবন, সবুজ কৃষি ও সবুজ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের Quarterly Review Report on Sustainable Finance (December 2025) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে ৬ হাজার ৯৮০ কোটি ৭০ লাখ টাকা সবুজ অর্থায়ন করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ গেছে জ্বালানি ও সম্পদ-দক্ষতা খাতে। এ খাতে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৫৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদনব্যবস্থায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পদের আরও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগই এ প্রান্তিকে সবুজ অর্থায়নের প্রধান অংশ দখল করেছে।
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একই সময়ে অর্থায়ন হয়েছে ৩৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সৌরবিদ্যুৎসহ পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সবুজ অর্থায়নে শুধু নতুন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নয়, বিদ্যমান উৎপাদনব্যবস্থায় জ্বালানি ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশবান্ধব পণ্য ও প্রকল্পে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দিয়ে আসছে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বর্জ্য শোধনাগার এবং পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদনের মতো খাত এই ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। সময়ের সঙ্গে এই কাঠামো আরও বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বা পণ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম থেকে ৪২টি প্রকল্পে ৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড থেকে ৮টি প্রকল্পে দেওয়া হয় ৩০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন তহবিল থেকে ৭টি প্রকল্পে দেওয়া হয় ৭১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এ ধরনের পুনঃঅর্থায়ন তুলনামূলক কম ব্যয়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ থেকে সবুজ কারখানা। বাংলাদেশের শিল্প খাতে গ্রিন ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে জ্বালানি দক্ষতা ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে। রপ্তানিমুখী শিল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতি, সৌরবিদ্যুৎ, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বর্জ্য শোধনাগার ও শক্তি-দক্ষ অবকাঠামোতে অর্থায়ন উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষ করে পোশাকশিল্পে পরিবেশবান্ধব কারখানার বিস্তার বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধাও তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রমেই সরবরাহকারীদের পরিবেশ, জ্বালানি ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনা ও কার্বন নিঃসরণের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে সবুজ অর্থায়ন কেবল পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়; এটি রপ্তানি সক্ষমতা রক্ষার অর্থনৈতিক কৌশলও।
কৃষিতেও গ্রিন ব্যাংকিং। গ্রিন ব্যাংকিংয়ের পরিধি শিল্পকারখানার বাইরে কৃষিতেও বিস্তৃত। পানি সাশ্রয়ী সেচ, সৌরচালিত সেচব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, কৃষি-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াজাতকরণে অর্থায়ন বাড়ানো যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশের কৃষি যখন বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকির মুখে, তখন কৃষিঋণের উদ্দেশ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম কৃষি অবকাঠামো তৈরিতেও অর্থায়ন প্রয়োজন। ২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে টেকসই কৃষিতে ১০ হাজার ৬২৩ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা অর্থায়ন হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এই অর্থায়নকে টেকসই অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুযোগ। সবুজ রূপান্তরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে সহজে সৌরবিদ্যুৎ, আধুনিক যন্ত্রপাতি বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু ছোট উদ্যোক্তার জন্য এসব প্রযুক্তির প্রাথমিক ব্যয় বড় বাধা।
এ কারণে ব্যাংকগুলোকে সবুজ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ অর্থায়নের কাঠামোর মধ্যেই সবুজ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দের নির্দেশনা দিয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকি এখন আর্থিক ঝুঁকিও। জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন বা তাপপ্রবাহে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে উৎপাদন ও আয় কমে যেতে পারে। ফলে ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশগত ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ঋণঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কাঠামো জোরদার করছে। ২০২৫ সালের জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে জলবায়ুসম্পর্কিত ঝুঁকি ও সুযোগ শনাক্ত, মূল্যায়ন, ব্যবস্থাপনা ও প্রকাশের কাঠামোর মধ্যে আনতে আরও সুস্পষ্ট ভিত্তি দিয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে ২ লাখ ১৩ হাজার ৩৬৪টি প্রকল্প পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়নের আওতায় আসে এবং ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৩২টি মূল্যায়িত প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়। এসব অর্থায়নের মোট পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮১ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
সবুজ বন্ড ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। সবুজ প্রকল্পের অন্যতম সমস্যা হলো দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজ ভবন ও পরিচ্ছন্ন অবকাঠামোর বিনিয়োগের সুফল অনেক ক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে পাওয়া যায়। তাই স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি সবুজ বন্ড ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থার বিকাশ জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির জন্য সবুজ বন্ড অর্থায়ন নীতিমালা চালু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজনমূলক প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন অবকাঠামোগত সবুজ প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রয়েছে বেশ কিছু বাধাও। অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের গ্রিন ব্যাংকিংয়ের পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় অনেক উদ্যোক্তার জন্য বড় বাধা। একই সঙ্গে সব ব্যাংকের কর্মকর্তা ও মূল্যায়নকারীদের সবুজ প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত ঝুঁকি যাচাইয়ের সমান সক্ষমতা নেই।
আরেকটি সমস্যা হলো উপযুক্ত প্রকল্পের ঘাটতি। শুধু নিয়ন্ত্রক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন সবুজ প্রকল্প তৈরি হয় না। প্রকল্প তৈরি, সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও পরিবেশগত সনদ সংগ্রহে ছোট উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক আর্থিক দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ ও তারল্যচাপও নতুন ধরনের অর্থায়নের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই গ্রিন ব্যাংকিংকে এগিয়ে নিতে হলে একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি।
গ্রিনওয়াশিং ঠেকাতে হবে। শুধু ‘সবুজ’ নাম ব্যবহার করলেই কোনো প্রকল্প সবুজ হয়ে যায় না। গ্রিন ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো গ্রিনওয়াশিং—অর্থাৎ প্রকৃত পরিবেশগত সুফল সীমিত হলেও কোনো প্রকল্পকে অতিরঞ্জিতভাবে পরিবেশবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করা।
এ কারণে অর্থায়নের পরিমাণের পাশাপাশি ফলাফলও পরিমাপ করতে হবে। একটি প্রকল্পে কত বিদ্যুৎ সাশ্রয় হলো, কত পানি কম ব্যবহার হলো, কত বর্জ্য পুনর্ব্যবহার হলো কিংবা কত নিঃসরণ কমল—এসব তথ্য নিয়মিত পরিমাপ ও প্রকাশ করা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন ও টেকসই অর্থায়নের শ্রেণিবিন্যাস, পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত আর্থিক তথ্য প্রকাশের কাঠামো এই স্বচ্ছতা তৈরির ভিত্তি তৈরি করেছে।
গ্রিন ব্যাংকিংকে কেবল নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা পালন হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগবে না। বরং ব্যাংকগুলোর মধ্যে পরিবেশবান্ধব পণ্য ও সেবা উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির টেকসইতা রেটিং চালু করেছে এবং প্রতিবছর শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রকাশ করে। ২০২৪ সালের টেকসইতা রেটিংয়ে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় ছিল ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। একই রেটিংয়ে আইডিএলসি ফাইন্যান্স ও আইপিডিসি ফাইন্যান্স শীর্ষ ফাইন্যান্স কোম্পানির তালিকায় ছিল।এই ধরনের মূল্যায়ন ব্যাংকগুলোর মধ্যে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসনভিত্তিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে।
আগামী দিনে গ্রিন ব্যাংকিংকে আরও কার্যকর করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, পরিবেশগত ঝুঁকিকে ঋণ অনুমোদনের মূল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সবুজ প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী অর্থায়ন বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ছোট উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাংক, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। চতুর্থত, সবুজ বন্ড, জলবায়ু অর্থায়ন ও মিশ্র অর্থায়নের মতো বিকল্প ব্যবস্থা আরও বিকশিত করতে হবে। পঞ্চমত, সবুজ অর্থায়নের ফলাফল পরিমাপ ও প্রকাশের মাধ্যমে গ্রিনওয়াশিং ঠেকাতে হবে।
সবুজ ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে ব্যাংকের নিজস্ব কার্যক্রমকেও যুক্ত করতে হবে। বিদ্যুৎ ও পানি সাশ্রয়, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কাগজের ব্যবহার কমানো, ডিজিটাল সেবা এবং ভবিষ্যতে কার্বন নিঃসরণ পরিমাপ—এসবকে ব্যাংকের সামগ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ করা প্রয়োজন।
গ্রিন ব্যাংকিং কেবল একটি ব্যাংকিং কৌশল নয়; এটি অর্থনীতির অর্থপ্রবাহকে ভবিষ্যৎ-সহনশীল করার একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। ব্যাংক যে অর্থায়ন করে, তার মাধ্যমেই কোনো অর্থনীতি পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির দিকে যেতে পারে, আবার ভুল অর্থায়নের মাধ্যমে পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই ব্যাংকের ঋণনীতির সঙ্গে পরিবেশনীতি যুক্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ গত দেড় দশকে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। ২০১১ সালের গ্রিন ব্যাংকিং নীতি থেকে শুরু করে টেকসই অর্থায়ন নীতি, পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সবুজ বন্ড, টেকসইতা রেটিং এবং জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক খাতে সবুজ রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তবে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো পরিমাণ থেকে গুণগত মানে যাওয়া। কত কোটি টাকা সবুজ অর্থায়ন হয়েছে, শুধু সেটিই যথেষ্ট নয়; সেই অর্থায়নে বাস্তবে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হলো, কতটা দূষণ কমল, কতটি কর্মসংস্থান তৈরি হলো এবং কতটা জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ল—তারও হিসাব থাকতে হবে।
পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যাংক কার্ড থেকে শুরু করে ডিজিটাল ব্যাংকিং, সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি-দক্ষ শিল্প, পরিবেশবান্ধব কৃষি, সবুজ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো—সবখানেই ব্যাংকিং খাত পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। এখন প্রয়োজন সেই পরিবর্তনকে আরও গভীর, স্বচ্ছ ও বাস্তবমুখী করা।
কারণ সবুজ অর্থায়ন কেবল প্রকৃতি রক্ষার জন্য নয়; এটি ব্যাংকের নিজের ভবিষ্যৎও রক্ষার প্রশ্ন। জলবায়ু ঝুঁকিকে যে ব্যাংক আজ অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করবে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে যে ব্যাংক আজ বিনিয়োগ করবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে যে ব্যাংক টেকসই অর্থায়ন করবে—আগামী দিনের পরিবর্তিত অর্থনীতিতে তারাই অধিক স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকবে। অর্থের প্রবাহ যদি সবুজ পথে পরিচালিত হয়, তবে উৎপাদনও বদলাবে, বিনিয়োগের চরিত্রও বদলাবে এবং ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে আরও নিরাপদ, জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই বাংলাদেশ।

