সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে বিচারাঙ্গনে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলার তদবির থেকে শুরু করে শুনানির তালিকায় নাম তোলা—প্রতিটি ধাপেই দুর্নীতি ঘটছে বলে আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন। তিনি নির্দিষ্টভাবে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট—উভয় স্তরে তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন এবং কিছু বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ এনেছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই স্বীকারোক্তি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের বিচারব্যবস্থা নিজেই একটি বড় সংস্কার-পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া, মামলাজট এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে ইতিমধ্যে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। ফলে খোকনের বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ হিসেবে না দেখে, বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সংকটের অংশ হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।
বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু ও যুক্তিকাঠামো
খোকনের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি দুর্নীতিকে সাধারণ প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে না দেখিয়ে বরং বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো, দেশের অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হলে তার বিচার শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টেই হয়। ফলে যদি খোদ সুপ্রিম কোর্টেই বিচারপ্রার্থীদের টাকা দিতে হয়, তাহলে ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থলটিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই যুক্তিটি বিশ্লেষণ করলে একটি বৃত্তাকার সংকট (vicious cycle) ধরা পড়ে:
– দুর্নীতির বিচার হওয়ার কথা আদালতে;
– কিন্তু আদালতে পৌঁছাতেই যদি তদবির ও অর্থ লাগে, তাহলে দুর্নীতির প্রতিকার নিজেই দুর্নীতির শিকার হয়ে পড়ে;
– ফলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীর জন্য প্রতিকারের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, আর যাদের সামর্থ্য আছে তারাই কেবল দ্রুত সুবিচার পান।
এভাবে দেখলে বোঝা যায়, এটি নিছক নৈতিক সমস্যা নয়—বরং একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা, যেখানে জবাবদিহিতার শেষ স্তরটিই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তিনি এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণকে দুর্নীতিমুক্ত করার দাবিও জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গণ থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং আইনজীবীদের জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ তৈরির দাবিও তিনি জানিয়েছেন। এখানে লক্ষণীয়, তাঁর দাবির একটি বড় অংশ ভৌত অবকাঠামো (শেড, কিউবিক্যাল, হলরুম) কেন্দ্রিক—যা মূল অভিযোগের (প্রক্রিয়াগত দুর্নীতি) সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও, এটি ইঙ্গিত দেয় যে আইনজীবী সমিতির অগ্রাধিকার কাঠামোগত সংস্কার এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা—উভয় দিকেই বিভক্ত।
মূল কারণ কেন এই দুর্নীতি ব্যবস্থাগতভাবে টিকে আছে। বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ সামনে আসে, যেগুলো এই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ব্যাখ্যা করতে পারে:
১. মামলাজট ও বিচারক স্বল্পতা: দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলাজটের কারণে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত শুনানি পেতে বাড়তি তদবির বা অর্থের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে মামলাজট কমাতে উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতে পর্যাপ্তসংখ্যক বিচারক নিয়োগ প্রয়োজন।
২. স্বচ্ছতাহীন তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়া: মামলার শুনানির তালিকা কীভাবে তৈরি হয়, তার সুনির্দিষ্ট, প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য মানদণ্ডের অভাব—যা তদবিরনির্ভরতা তৈরি করে।
৩. বিচারক নিয়োগ ও শৃঙ্খলা প্রক্রিয়ার দুর্বলতা: বিচার বিভাগ সংস্কার সংক্রান্ত একটি কমিশন সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও অপসারণ প্রক্রিয়াকে সংস্কারের কেন্দ্রীয় এজেন্ডা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং বিচারকদের সম্পদ পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশগুলো নিজেই প্রমাণ করে যে নিয়োগ ও জবাবদিহিতার প্রচলিত কাঠামো পর্যাপ্ত নয় বলে নীতিনির্ধারকরাও মনে করছেন।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার অস্থিতিশীলতা: বিচার বিভাগের স্বাধীন সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল বা স্থগিত হওয়ার মতো ঘটনায় স্বচ্ছতা আন্তর্জাতিক সংস্থার (টিআইবি) সমালোচনার মুখে পড়েছে—যা দেখায় যে সংস্কার প্রক্রিয়া নিজেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনে দুর্বল হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ও সংস্কার-প্রয়াস: বিষয়টি একেবারে অগোচরে নেই। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ইতিমধ্যে বেশ কিছু সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে—পুলিশের পরিবর্তে স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা গঠন, বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করে মামলার চাপ বিকেন্দ্রীকরণ, এবং দুর্নীতি রোধে বিচারকদের সম্পদের নিয়মিত নজরদারি। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে খোকনের অভিযোগ করা সমস্যাগুলোর কাঠামোগত সমাধান সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—রাজনৈতিক ঐকমত্য ও বাস্তবায়নের সদিচ্ছা কতটা টেকসই হবে, বিশেষত যখন সংশ্লিষ্ট কিছু অধ্যাদেশ ইতিমধ্যে বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।
গুরুত্ব ও তাৎপর্য
১. প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট: সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির মতো একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির মুখে এই অভিযোগ আসা জনগণের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
২. স্ব-সমালোচনার তাৎপর্য: আইনজীবী সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের প্রধান নিজেই যখন আইনজীবী ও বিচারিক কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন, তখন তা বাহ্যিক অভিযোগের চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে—কারণ তিনি নিজেই এই ব্যবস্থার ভেতরের একজন অংশীজন।
৩. শ্রেণিগত প্রভাব: তদবির ও অর্থনির্ভর বিচারপ্রাপ্তি মূলত সামর্থ্যহীন সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা ন্যায়বিচারে সমতার নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৪. সংস্কারের দাবি বনাম বাস্তবায়ন-ঘাটতি: কমিশন পর্যায়ে সুপারিশ থাকলেও, খোকনের বক্তব্য প্রমাণ করে যে বাস্তব চিত্র এখনো আগের মতোই—অর্থাৎ নীতিগত সুপারিশ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
সীমাবদ্ধতা ও প্রশ্ন
এই বক্তব্য মূলত সাধারণ অভিযোগ আকারে এসেছে—নির্দিষ্ট নাম, ঘটনা বা প্রমাণ ছাড়াই। ফলে এটি জনমত তৈরিতে কার্যকর হলেও, তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপের জন্য যথেষ্ট নয়। কতটা দুর্নীতি বাস্তবিক অভিজ্ঞতা থেকে বলা এবং কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির অংশ, তা যাচাই করা কঠিন। একইসঙ্গে খোকনের নিজের বিচার বিভাগের সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন মতানৈক্য ও বিতর্কের ইতিহাসও রয়েছে, যা তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বুঝতে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এছাড়া, সাধারণীকৃত অভিযোগ কখনো কখনো ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্বকেও প্রতিফলিত করতে পারে, যা বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নে আলাদা করে দেখা জরুরি।
মাহবুব উদ্দিন খোকনের এই বক্তব্য বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে যেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াতেই অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। মামলাজট, অস্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়া, দুর্বল নিয়োগ ও শৃঙ্খলা কাঠামো এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল সংস্কার প্রক্রিয়া—এই কয়েকটি কারণ একসঙ্গে মিলে একটি এমন পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে তদবির ও অর্থই বিচারপ্রাপ্তির অলিখিত পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি নিছক একটি মন্তব্য নয়, বরং বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি জরুরি জাতীয় আলোচনার সূচনা বিন্দু হতে পারে। তবে অভিযোগগুলোর প্রকৃত পরিধি ও গভীরতা নিরূপণে স্বতন্ত্র তদন্ত, প্রাতিষ্ঠানিক নিরীক্ষা এবং সংস্কার কমিশনের সুপারিশের বাস্তবায়ন—তিনটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

