চট্টগ্রামে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ওয়াসিমসহ ছয়জন হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়নি। এর মধ্যেই মামলার কয়েকজন সাক্ষীকে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে হুমকি, ভয়ভীতি ও সাক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রলোভন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কারও কাছে পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সাক্ষীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর অনুসারীরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসামিপক্ষ বলছে, সত্যিই হুমকি দেওয়া হয়ে থাকলে সাক্ষীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করা উচিত।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের পুনর্বিবেচনার আবেদন বিচারাধীন। ফলে সাক্ষ্যগ্রহণের আগেই সাক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও সাক্ষী সুরক্ষা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সাক্ষ্য না দিলে ‘ভালো ভবিষ্যতের’ প্রলোভন
ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেওয়ার কথা রয়েছে এমন কয়েকজন সাক্ষী জানান, তাদের কাছে বিভিন্ন বিদেশি নম্বর থেকে ফোন এসেছে। সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য চাপের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে আর্থিক সুবিধা ও বিদেশে পড়াশোনার সুযোগের প্রলোভন।
সাক্ষী সম্রাট রোবায়েতের দাবি, তার আত্মীয়দের ফোন করে সাক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি এক চাচাতো ভাইকে তুলে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে তার অভিযোগ।
রোবায়েতের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে হামলার ঘটনাগুলো তিনি ও অন্যরা সরাসরি দেখেছেন। সে কারণে তাকে সাক্ষ্য দিতে না দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
বিদেশি নম্বর থেকে হুমকি, ফাঁস হয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য?
আরেক সাক্ষী আনিস আহমেদের দাবি, দুবাইয়ের একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে তাকে ফোন করে সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য শাসানো হয়েছে। ফোনদাতা তার বাসার ঠিকানা, মা ও বোনের মোবাইল নম্বর পর্যন্ত জানতেন।
আনিসের প্রশ্ন, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দেওয়ার সময় দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে হুমকিদাতাদের হাতে গেল।
তার ধারণা, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ এসব তথ্য ব্যবহার করে সাক্ষীদের ওপর চাপ তৈরি করছে। তবে এ বিষয়ে কারও বিরুদ্ধে সরাসরি দায় প্রমাণিত হয়নি।
নিরাপত্তা চেয়ে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে আবেদন
সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সাক্ষী রেজাউল করিম।
তিনি অভিযোগ করেছেন, মামলার আসামি ফজলে করিম ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে বিচারিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত ও বিলম্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আবেদনে হুমকির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা একজনের ফোন নম্বরও দেওয়া হয়েছে এবং নিজের পাশাপাশি অন্য সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আরেক নারী সাক্ষী আছিয়া খাতুনের দাবি, জর্ডানের একটি নম্বর থেকে ‘রহমান’ পরিচয়ে একজন ফোন করে জানতে চান, ফজলে করিমের বিরুদ্ধে কেন এবং কত টাকার বিনিময়ে তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন। জীবন বাঁচাতে হলে সাক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়ানোর কথাও বলা হয় বলে তার অভিযোগ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অপপ্রচারের অভিযোগ
শুধু ফোনে হুমকির অভিযোগ নয়, সাক্ষীদের একজন সম্রাট রোবায়েতকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও উঠেছে।
তার ছবি, মোবাইল নম্বর ও পরিচয় প্রকাশ করে তাকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে পোস্ট দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে এসেছে। এরপর বিদেশি নম্বর থেকে নিয়মিত ফোন করে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
এ ধরনের প্রচারণা সাক্ষীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার মানসিক পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
আসামিপক্ষের প্রশ্ন, অভিযোগের ভিত্তি কোথায়?
ফজলে করিমের আইনজীবী ব্যারিস্টার রিজওয়ানা ইউসুফ এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, ফজলে করিমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই এবং রিভিউ আবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হবে।
সাক্ষীদের হুমকির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি নিজেও অচেনা নম্বর থেকে হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেছেন। সাক্ষীরা সত্যিই হুমকি পেলে তাদেরও আইনগতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
‘হুমকি দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া বানচাল করা যাবে না’
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, কয়েকজন সাক্ষী নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করায় স্থানীয় থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তার বক্তব্য, সাক্ষী সুরক্ষার আইনি ব্যবস্থা রয়েছে এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তথ্য ফাঁসের অভিযোগ প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর সেটি প্রকাশ্য নথিতে পরিণত হয় এবং আসামিপক্ষও তা পাওয়ার আইনগত অধিকার রাখে। ফলে তথ্য কোথা থেকে কার হাতে গেছে, তা সব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, হুমকি বা চাপ সৃষ্টি করে বিচারপ্রক্রিয়া বানচাল করা যাবে না।
সাক্ষ্যগ্রহণের আগেই যে প্রশ্নগুলো সামনে
এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর ৬ আগস্ট থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর কথা ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষের পুনর্বিবেচনার আবেদনের কারণে সেই প্রক্রিয়া আটকে আছে। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর এ আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ মোট ২২ জন আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন কারাগারে এবং অন্যরা পলাতক।
ফলে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগেই সাক্ষীদের হুমকি, ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ এবং সাক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রলোভন—সব মিলিয়ে মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার নিরাপত্তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইনের দৃষ্টিতে কোনো সাক্ষীকে ভয় দেখানো, প্রভাবিত করা বা সাক্ষ্য থেকে বিরত রাখার চেষ্টা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাধীনতার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন ট্রাইব্যুনাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার জন্য বড় পরীক্ষা।

