কক্সবাজারের মহেশখালীতে মো. ফয়সালের মৃত্যু কেবল একটি হত্যার অভিযোগ নয় – এটি আইন, মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার সামনে একটি ভয়াবহ প্রশ্ন।
ঘটনা যা ঘটেছিল
১৫ সেপ্টেম্বর বড় মহেশখালীর পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকায় ফয়সালকে চোর সন্দেহে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর পিঠের ওপর ইট রেখে নির্যাতন চালানো হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজন কিশোরকে সেই নির্যাতনে অংশ নিতে দেখা গেছে। একজন জনপ্রতিনিধি নাকি ঘটনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফয়সালের চার বছরের একটি সন্তান রয়েছে এবং তাঁর স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অর্থাৎ একজন মানুষকে হত্যার সঙ্গে সঙ্গে একটি শিশুর কাছ থেকে তার বাবাকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে; আর একজন অনাগত সন্তানের পৃথিবীতে আসার আগেই তার বাবার কবর তৈরি হয়েছে।
ধরে নিলাম, ফয়সাল চুরি করেছিলেন। তারপর?
এই প্রশ্নটির উত্তর খুবই সরল।
চুরি অপরাধ হলে তার বিচার আদালতে হবে। পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কোনো ব্যক্তি, কোনো জনতা কিংবা কোনো জনপ্রতিনিধির নেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনের আশ্রয় ও আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী ছাড়া কাউকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
অর্থাৎ অভিযোগ সত্য হলেও তার পরবর্তী ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল পুলিশ, তদন্ত ও আদালত কিন্তু কোনভাবেই ইটের স্তূপ নয়।
আর যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে ইচ্ছাকৃতভাবে মারধর, নির্যাতন বা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ফয়সালের মৃত্যু ঘটানো হয়েছে, তাহলে ঘটনাটি হত্যার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের প্রশ্ন তুলতে পারে। দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা অবশ্য তদন্ত ও আদালতের নির্ধারণের বিষয়।
শিশুদের দিয়ে নির্যাতন করানো হলে দায় কার?
এখানেই ঘটনাটি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
প্রকাশিত ভিডিওতে কিশোরদের অংশগ্রহণের দৃশ্য দেখা গেলেও, কোন জনপ্রতিনিধি তাদের ব্যবহার বা নির্দেশ দিয়েছিলেন এমন অভিযোগ এখনো নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই এ বিষয়ে তদন্ত ছাড়া কারও বিরুদ্ধে নিশ্চিত অভিযোগ তোলা উচিত নয়।
তবে তদন্তে যদি প্রমাণ হয় যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশুদের দিয়ে অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা, সহায়তা বা নির্দেশ দিয়েছেন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। দণ্ডবিধির ১০৭ ধারায় প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র বা ইচ্ছাকৃত সহায়তাকে ‘abetment’ বা অপরাধে প্ররোচনা/সহায়তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে; ১০৮ ধারার ব্যাখ্যায় এমনকি শিশু বা আইনগতভাবে অপরাধ করার সক্ষমতা নেই এমন ব্যক্তিকে ব্যবহার করেও অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে প্ররোচনাকারীর দায়ের কথা বলা হয়েছে।
অবশ্য শিশুদের নিজেদের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আলাদা আইনগত বিধান আছে। দণ্ডবিধির ৮২ ধারায় নয় বছরের কম বয়সী শিশুর কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না এবং ৮৩ ধারায় নয় থেকে বারো বছরের শিশুর ক্ষেত্রে তার কাজের প্রকৃতি ও পরিণতি বোঝার মতো যথেষ্ট পরিপক্বতা ছিল কি না, সেটি বিবেচ্য।
অতএব শিশুকে সামনে দাঁড় করিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের দায় আড়াল করা যাবে না; আবার শিশুদের ক্ষেত্রেও আইন নিজের নির্ধারিত প্রক্রিয়াতেই চলবে।
ফয়সালের শেষ প্রশ্নটির উত্তর কে দেবে?
প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুর আগে ফয়সাল পানি চেয়েছিলেন। তাঁর শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল বলেও হাসপাতাল-সংক্রান্ত তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
একজন মানুষ চুরি করেছে কি না সেটি তদন্তের বিষয়।
কিন্তু একজন মানুষকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা, তাঁর ওপর ইট চাপিয়ে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু ঘটানো এগুলো কোনো সভ্য সমাজে ‘বিচার’ হতে পারে না।
বিচার যদি জনতার হাতে চলে যায়, তাহলে আদালতের প্রয়োজন কী?
আইন যদি ইটের নিচে চাপা পড়ে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনই বা কোথায়?
ফয়সাল নির্দোষ ছিলেন, নাকি সত্যিই কোনো অপরাধ করেছিলেন সেটি আদালত নির্ধারণ করবে। কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যেই পরিষ্কার: অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার লাইসেন্স কাউকে দেওয়া হয়নি।
এখন করণীয়
এখন প্রয়োজন শুধু কয়েকজনকে আটক করা নয়। প্রয়োজন—
– নিরপেক্ষ তদন্ত
– প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি সংগ্রহ
– ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত সংরক্ষণ
– ময়নাতদন্তের ফল যাচাই
– প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভূমিকা নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ
কারণ ফয়সালের মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়।
চার বছরের শিশুটি হয়তো এখনো বোঝে না তার বাবা আর ফিরবে না। তাঁর অনাগত সন্তানও কোনোদিন জানতে পারবে না, পৃথিবীতে আসার আগে তার বাবা কীভাবে আইনের বদলে মানুষের হাতে বিচার পেয়েছিলেন।
একটি মোবাইলের দাম যতই হোক, একটি মানুষের জীবনের দাম তার চেয়ে অসীম বেশি।
চুরির অভিযোগের বিচার আদালত করবে—ইটের স্তূপ নয়।

