রাজধানী ঢাকার যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বড় ধরনের উদ্যোগ নিল সরকার। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) একসঙ্গে তিনটি মেট্রো রেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলো হলো, মেট্রো রেল লাইন-৫ সাউদার্ন রুট, মেট্রো রেল লাইন-১ এবং মেট্রো রেল লাইন-৫ নর্দান রুট। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে একনেকে। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটটি দেশের প্রথম পাতাল মেট্রো রেলপথ। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ২০১৯ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার প্রাক্কলনে। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নকশা চূড়ান্তকরণে বিলম্ব, টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রস্তুতিতে জটিলতা এবং স্টেশনের আকার-আকৃতি পরিবর্তনের মতো নানা কারণে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। এমআরটি লাইন-১-এর স্টেশনগুলোর মধ্যে নটুন বাজারের স্টেশন ৬৭০ মিটার, কমলাপুর ৪২০ মিটার এবং বিমানবন্দর স্টেশন ৩৮০ মিটার পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নে অনুমোদন পেয়েছে নতুন এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্প। ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার পাতালপথসহ মোট ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে আসবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা, বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা আসবে এডিবি ও কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের ঋণ থেকে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্টের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। টেকনিক্যাল মোড়, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, সুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে এই রুট। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশটি পাতালে এবং আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশটি উড়ালসড়কে নির্মিত হবে।
জাইকার অর্থায়নে ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ নর্দান (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয়ও একই সভায় অনুমোদিত হয়েছে। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০১৯ সালে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকার প্রাক্কলনে। অর্থাৎ প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে ১১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বর্ধিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিলের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকায়, আর জাইকার ঋণ অংশ দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকায়।
তিনটি মেট্রো রেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং করের হার বৃদ্ধি সরাসরি প্রকল্প ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি নকশা পরিবর্তন, স্টেশনের আকার বৃদ্ধি, ডিপোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভূমি অধিগ্রহণের খরচ বেড়ে যাওয়াও ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ। এমআরটি লাইন-১-এর ক্ষেত্রে স্টেশনগুলোর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বাড়ানো, স্টেশনের প্রবেশ-বাহির পথের অবস্থান পরিবর্তন এবং রাজারবাগ স্টেশনকে দুই তলা থেকে তিন তলায় উন্নীত করার মতো পরিবর্তনগুলো ব্যয় বাড়িয়েছে। এছাড়া নির্মাণকাজ চলাকালীন যানজট ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় ২০ কিলোমিটার ডিটর রোড নির্মাণের পরিকল্পনাও যুক্ত হয়েছে, যা ব্যয়ের অঙ্ক বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রো রেল প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি। বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেছেন, নতুন মেট্রো প্রকল্পে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাপানি ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলোতে সেই সুযোগ ছিল না। একক অর্থায়ননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন। তবে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পর প্রকল্প ব্যয় কমতে বা বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। মান নিয়ে সতর্ক থাকার ওপরও জোর দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
একনেকের এই অনুমোদনের ফলে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মেট্রো রেল লাইন-১, লাইন-৫ নর্দান ও লাইন-৫ সাউদার্ন এই তিনটি রুট একসঙ্গে চালু হলে রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম করিডোরস সংযুক্ত হবে। যাত্রীরা এক মেট্রো লাইন থেকে আরেকটিতে ইন্টারচেঞ্জ করে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত পৌঁছাতে পারবেন। এতে সড়কপথে যানবাহনের চাপ কমবে এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। তবে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কতটা সময়মতো ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

