নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দীর্ঘ সাত বছর কারাবন্দী থাকার পর হাইকোর্টের রায়ে খালাস পেয়েছেন কামরুন নাহার মনি। তবে তার এই মুক্তির গল্পে জড়িয়ে আছে আরও এক করুণ অধ্যায়—তার শিশুকন্যা মোবাস্বেরা খানম রাথির শৈশবের প্রতিটি দিন কেটেছে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরেই।
২০১৯ সালের এপ্রিলে যখন কামরুন নাহার মনিকে গ্রেফতার করা হয়, তখন তিনি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বিচার চলাকালে প্রতিটি কার্যদিবসে তাকে আদালতে হাজির হতে হতো। তার আইনজীবী একাধিকবার জামিনের আবেদন করেন এবং অন্তঃসত্ত্বা অবস্থা বিবেচনায় ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি চান, কিন্তু আদালত প্রতিবারই সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।
কয়েক মাস পর, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন মনি, যাকে তিনি ডাকতেন ‘রোজা’ নামে। কিন্তু এই সন্তানের বয়স যখন সবে এক মাস, তখনই নিম্ন আদালত মনিসহ মোট ১৬ জন আসামিকে ফাঁসির রায় দেয়। এরপর স্তন্যপান করা এই শিশুকে নিয়েই মনিকে পাঠানো হয় গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে।
মনি জানিয়েছেন, কারাগারের ভেতরে সন্তান লালন-পালন করা কতটা কঠিন ছিল। খেলনার অভাবে মোজা দিয়ে বানাতেন পুতুল, বালিশকে বানাতেন স্কুলব্যাগ। মা ও মেয়ের এই যন্ত্রণা আসলে অন্য কারও বোঝার সাধ্য নেই বলেই মনে করেন তিনি। মুক্তির পর মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়া এই মা একইসঙ্গে তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসির আসামি বানানোর বিচার দাবি করেছেন।
দীর্ঘ কারাবাসের পুরো সময় জুড়ে মনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন। তার অভিযোগ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের হেফাজতে তাকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, এমনকি পেটে লাথি মেরে গর্ভপাতের হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। কিন্তু নিম্ন আদালতের রায়ের পর ছয় বছরের বেশি সময় তাকে কাটাতে হয় ফাঁসির সেলে, যেখানে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বেড়ে ওঠে তার শিশুকন্যা। পরিবারের আর্থিক দুর্দশা ও ঋণের বোঝার কারণে মনির মা নিজের নাতনিকে দেখতে যাওয়ার সুযোগও খুব একটা পেতেন না।
দীর্ঘ শুনানির পর গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নুসরাত হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে। এই রায়ে মোট দশ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন কামরুন নাহার মনিও। বাকি আসামিদের মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং চারজনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন মনির স্বামী রাশেদুল আলম খান। তিনি বলেন, একজন বাবা হয়েও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শারীরিক দূরত্বের কারণে দীর্ঘদিন তিনি নিজের মেয়েকে স্পর্শ করার সুযোগ পাননি। ফেনী ও কাশিমপুর কারাগারে শিকল ও জালের ফাঁক দিয়ে মেয়েকে দেখার চেষ্টার স্মৃতি এখনও তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় বলে জানান তিনি।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাদে নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর কয়েকদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে নুসরাতের ভাই সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষেই হাইকোর্ট সম্প্রতি এই রায় দিলেন—একটি রায় যা কেবল একজন মায়ের মুক্তির গল্প নয়, বরং একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশবেরও নীরব সাক্ষী।

