দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলাগুলোর বিচার নিষ্পত্তিতে চরম ধীরগতি চলছে, যার ফলে সারা দেশের আদালতে এখন বিচারাধীন রয়েছে প্রায় আট হাজার মামলা। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে ঝুলে আছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মামলা, আর সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মামলা। আইন অনুযায়ী তদন্ত শেষ করতে হবে ১২০ দিনে এবং বিচার নিষ্পত্তি করতে হবে ৬০ দিনে, কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম মানার নজির খুবই বিরল।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে স্পষ্ট বলা আছে, ক্ষমতাপ্রাপ্তির তারিখ থেকে নির্দিষ্ট কর্মদিবসের মধ্যেই তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তদন্ত শেষ করতে হবে। যুক্তিসংগত কারণ দেখাতে পারলে সীমিত সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও, তারপরও ব্যর্থ হলে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্নের বিধান রয়েছে, সঙ্গে ব্যর্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও কথা। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব বিধান কার্যত অনুসরণ করা হচ্ছে না, বরং অনেক মামলার তদন্তেই লেগে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে পুরোনো একটি বিশেষ আইনের অধীনে গঠিত বিশেষ জজ আদালতেরও একই দশা। সেই আইন অনুযায়ী মামলা আমলে নেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক মামলার নিষ্পত্তি হতে সময় লেগে যাচ্ছে এক যুগেরও বেশি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে একটি নির্দেশনা জারি করে সব জেলা ও মহানগর দায়রা জজ আদালতকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই নির্দেশনাও মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত বেশ কয়েকটি মামলার অগ্রগতি খতিয়ে দেখলে এই ধীরগতির চিত্র স্পষ্ট হয়। বিসিএস প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে আলোচিত সরকারি কর্ম কমিশনের এক সাবেক গাড়িচালক ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে গত বছরের শুরুতে দায়ের হওয়া তিনটি পৃথক মামলার একটির তদন্ত শেষ করতেই সময় লেগেছে পুরো এক বছর, আর বাকি দুটির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। একইভাবে পুলিশের এক সাবেক মহাপরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তেও সময় লেগেছে প্রায় এক বছর, বর্তমানে যা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে এক সাবেক মন্ত্রীসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত শেষ হতে সময় লেগেছিল সাড়ে পাঁচ মাস, বর্তমানে যেখানে অসংখ্য সাক্ষীর মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে আলোচিত ছাগলকাণ্ডে জড়িত রাজস্ব বোর্ডের এক সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলার তদন্তে সময় লেগেছে প্রায় ১৪ মাস।
সবচেয়ে দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ পাওয়া যায় জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক কর্মকর্তার মামলায়, যেখানে তদন্তেই সময় লেগেছিল দুই বছর, আর চার্জশিট জমা দেওয়ার পরও দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু করা যায়নি। বারবার শুনানির তারিখ পিছিয়ে বর্তমানে তা আরও পরবর্তী তারিখে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এসব মামলার একটিতে রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবী জানান, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের অবস্থান নির্ণয়, জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের সন্ধান এবং আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনার মতো নানা কারণে তদন্তে বাড়তি সময় লাগতে পারে। তাঁর ভাষ্যে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও প্রায়ই ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পদ বিবরণী বা কাগজপত্র জমা দিতে দেরি করেন, যার প্রভাব পড়ে তদন্তের গতিতে। তিনি এ-ও বলেন, বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন আদালত ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হলেই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম বাতিল হয়ে যাবে না।
একই বিষয়ে দেশের একটি স্বনামধন্য দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার নির্বাহী প্রধান বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে তদন্ত শেষ না হওয়ার সমস্যা নতুন নয়, বরং প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এটি চলে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ ও মামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আগের কমিশন পদত্যাগ করার পর দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানটি কার্যত স্থবির থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। জনবল সংকট ও একজন কর্মকর্তার হাতে অনেক মামলার দায়িত্ব থাকাকেও তিনি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তাঁর মতে, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে অভিযুক্তরা প্রমাণ সরিয়ে ফেলা বা পরিবর্তনের সুযোগ পেয়ে যান, যা পুরো প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবকেও তিনি এই প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার পথে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করলেও সমস্যাগুলোর সমাধান যে সময়সাপেক্ষ, সে কথাও স্পষ্ট করে বলেন।
৬০ দিনের মধ্যে দুর্নীতি মামলার বিচার শেষ করার আইনি বিধান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মূল্যায়নে, এই সময়সীমা বাস্তবসম্মত না হলেও আদর্শ ও প্রত্যাশার দিক থেকে যুক্তিসংগত। দুর্নীতির মামলা বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জটিল প্রকৃতির, আর দেশের বিচারিক কাঠামোতেও বিশেষায়িত আদালতের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে তিনি মনে করেন। তবে সার্বিকভাবে দুর্নীতির মামলাগুলো যেন দ্রুততর সময়ে নিষ্পত্তি হয়, সেটাই সবার প্রত্যাশা বলে তিনি মন্তব্য করেন।

