জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে আবারও উঠে এলো রোহিঙ্গা সংকটের কথা। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জোর দেন। তিনি বলেন, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই।
বুধবার প্রায় শতাধিক দেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের শিরোনাম ছিল “দীর্ঘায়িত বাস্তুচ্যুতি থেকে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতাসহ একটি টেকসই সমাধানের নতুন আহ্বান।” প্রধানমন্ত্রী সেখানে বলেন, রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। এর আগের দিন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহের সঙ্গে বৈঠকেও তিনি একই কথা বলেন। আজ বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তার। এই ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক আইনে রোহিঙ্গা ইস্যু
এই সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে দুটি বড় আইনি লড়াই চলছে। একটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতে, আরেকটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে।
গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে। ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশনের অধীনে এই মামলা দায়ের করা হয়। এই বছরের জানুয়ারিতে তিন সপ্তাহ ধরে চূড়ান্ত শুনানি হয়েছে। আদালত এখন রায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রায় আসার কথা রয়েছে এই বছরের শেষ নাগাদ।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আলাদাভাবে তদন্ত চালাচ্ছে। মিয়ানমার এই আদালতের সদস্য না হলেও বাংলাদেশ সদস্য হওয়ায় আদালত এখতিয়ার পেয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আদালতের প্রধান কৌঁসুলি মিয়ানমারের সামরিক প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করেন। অভিযোগ, ২০১৭ সালের সহিংসতায় রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন ও নিপীড়নের জন্য তিনি দায়ী।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনও প্রমাণ সংগ্রহ করে যাচ্ছে। এই তথ্য দুই আদালতের মামলাতেই ব্যবহার হচ্ছে।
ইতিহাসে প্রত্যাবাসনের উদাহরণ
বিশ্বে এর আগেও বড় ধরনের শরণার্থী প্রত্যাবাসনের নজির আছে।
রুয়ান্ডার গণহত্যার পর লাখ লাখ শরণার্থী প্রতিবেশী দেশ থেকে দেশে ফিরে যায়। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এই প্রক্রিয়া কয়েক বছর ধরে চলে।
বসনিয়ার যুদ্ধের পর ডেটন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজ ঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। তবে এই প্রক্রিয়াও দ্রুত হয়নি।
কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ১৯৯০ এর দশকে থাইল্যান্ডের শিবির থেকে প্রায় চার লাখ শরণার্থী দেশে ফেরে। এটি ছিল জাতিসংঘের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রত্যাবাসন কর্মসূচি।
আফগান শরণার্থীদের পাকিস্তান থেকে ফেরানোর প্রক্রিয়াও কয়েক দশক ধরে চলছে। তবে বারবার তা থমকে গেছে দেশের ভেতরের অস্থিরতার কারণে।
এই উদাহরণগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রত্যাবাসন সহজ প্রক্রিয়া নয়। এতে সময় লাগে, আন্তর্জাতিক চাপ লাগে, আর সবচেয়ে বেশি দরকার হয় স্বদেশে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের সামনে বাধা
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
প্রথম সমস্যা হলো মিয়ানমারের ভেতরের সংঘাত। রাখাইন রাজ্যে এখনো সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াই চলছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে, এই সংঘাতের কারণে এখনই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
দ্বিতীয় সমস্যা যাচাই প্রক্রিয়ার ধীরগতি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মিয়ানমার এ পর্যন্ত মাত্র প্রায় দুই লাখ তিরাশি হাজার জনকে সাবেক রাখাইন বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ধীর গতিতে প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
তৃতীয় সমস্যা নাগরিকত্বের প্রশ্ন। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এই আইন বদলানো ছাড়া স্থায়ী সমাধান কঠিন।
চতুর্থ সমস্যা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। রোহিঙ্গারা নিজেরাও বারবার বলেছেন, নিরাপত্তা ও অধিকারের নিশ্চয়তা ছাড়া তারা ফিরতে রাজি নন। আগের চেষ্টাগুলোতেও এই কারণে স্বেচ্ছায় ফেরার হার ছিল খুবই কম।
পঞ্চম সমস্যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত চাপের অভাব। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এখনো একটি বড় বাধা হয়ে আছে।
শেষ কথা
আট বছরের বেশি সময় ধরে কক্সবাজারের শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন রোহিঙ্গারা। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়, অপরাধ আদালতের তদন্ত আর কূটনৈতিক তৎপরতা একসঙ্গে এগোলেও মাটির বাস্তবতা এখনো কঠিন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা আর নিরাপদ প্রত্যাবাসন, এই দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

