বিচার প্রশাসনে জেলা ও দায়রা জজ পদে সাম্প্রতিক বদলি ও পদায়নকে ঘিরে বিচারাঙ্গনের বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চার বিচারককে গুরুত্বপূর্ণ জেলা জজের দায়িত্ব দেওয়ার পর তাদের অতীত কর্মস্থল, দায়িত্ব পালনের সময়কার ভূমিকা এবং প্রশাসনিক রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিচারসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে থাকা এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ওঠা কয়েকজন বিচারককে ৫ আগস্টের পর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্য থেকেই কয়েকজনকে এবার আবার জেলা ও দায়রা জজের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে।
সম্প্রতি সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ৯৯ বিচারককে বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়ন করেছে আইন ও বিচার বিভাগ। এর মধ্যে চারজনের পদায়ন নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি। তারা হলেন মো. মনিরুজ্জামান, মো. বদরুল আলম ভূঁইয়া, মোহাম্মদ আস শামস জগলুল হোসেন এবং মো. রাকিবুল ইসলাম। তাদের যথাক্রমে বগুড়া, ফেনী, বরিশাল ও শরীয়তপুরের জেলা ও দায়রা জজ করা হয়েছে।
বিচারসংশ্লিষ্টদের একাংশের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক কার্যক্রমের সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এসব বিচারককে ৫ আগস্টের পর সরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকলে, তাদের আবার জেলা জজের মতো সংবেদনশীল পদে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন কেন হলো?
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, নতুন পদায়নের আগে তাদের অতীত কর্মস্থলের ভূমিকা, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং সে সময় ওঠা অভিযোগ-আপত্তি যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না।
বগুড়ায় মনিরুজ্জামানকে ঘিরে বিরোধিতা
চার বিচারকের মধ্যে বগুড়ার নতুন জেলা ও দায়রা জজ মো. মনিরুজ্জামানের পদায়ন নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ্য বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বগুড়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৫ আগস্টের পর আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর সম্প্রতি তাকে আবার বগুড়ার জেলা ও দায়রা জজ পদে পদায়ন করা হয়। নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বিচারাঙ্গনে অসন্তোষ দেখা দেয়।
বগুড়া আইনজীবী সমিতি সংবাদ সম্মেলন করে তার পদায়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। আইনজীবীরা তার আগের দায়িত্ব পালনের সময়কার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে নতুন পদায়নের বিরোধিতা করেন। তাকে ঘিরে আইনজীবীদের কর্মসূচির পাশাপাশি আদালত প্রাঙ্গণেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার থেকে ফেনীর জেলা জজ
মো. বদরুল আলম ভূঁইয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকার আদালতেও তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
বিচারাঙ্গনের একাধিক সূত্রের দাবি, ওই সময়ে তার প্রশাসনিক প্রভাব এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে এগুলো সূত্রের দাবি হিসেবেই এসেছে।
৫ আগস্টের পর তাকে আগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক পদায়নে তাকে ফেনীর জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর থেকে বরিশালের জেলা জজ
মোহাম্মদ আস শামস জগলুল হোসেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ছিলেন। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার বিচারিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সময়েও তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে তিনি ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ৫ আগস্টের পর তাকে আগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সাম্প্রতিক পদায়নে তাকে বরিশালের জেলা ও দায়রা জজ করা হয়েছে। এ নিয়েও বিচারসংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
আইন মন্ত্রণালয় থেকে শরীয়তপুরে রাকিবুল
মো. রাকিবুল ইসলাম আগে আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ছিলেন। আইন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তৌফিকা করিমের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে আলোচিত ছিল বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।
মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে অনেকে তাকে তৌফিকা করিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে জানতেন বলেও সূত্রগুলোর দাবি। ৫ আগস্টের পর রাকিবুল ইসলামকেও আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এবার তাকে শরীয়তপুরের জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
সার্ভিস রেকর্ড কতটা যাচাই হয়েছে?
বিচার বিভাগের একাধিক সূত্রের বক্তব্য, কোনো বিচারক বা কর্মকর্তাকে অতীতে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকলে, তার পেছনের কারণ নতুন পদায়নের সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, একজন বিচারক কোন সময়ে কোথায় দায়িত্ব পালন করেছেন, কী ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ বা আপত্তি ছিল কি না—এসব তথ্য পদায়নের আগে পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় বিচার বিভাগে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
৫ আগস্টের পর চার বিচারকের কয়েকজনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয় এবং নতুন পদায়নের আগে তাদের সার্ভিস রেকর্ড পর্যালোচনা করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের বিষয়ে যেসব প্রতিবেদন থাকার কথা, সেগুলো তাদের কাছে রয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বিষয় পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
আগের সার্ভিস রেকর্ড যাচাই-বাছাই করা হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা ‘পলিটিক্যাল আইডেন্টিটি’ যাচাই করেন না। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য ও তাদের কাছে থাকা নথির ভিত্তিতেই কাজ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিষয়গুলো তারা দেখেন এবং পর্যালোচনা করেন।
কয়েকজন বিচারকের বিরুদ্ধে অতীতে রাতের আঁধারে রায় দেওয়ার অভিযোগ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হলে রেজিস্ট্রার জেনারেল বলেন, এসব অভিযোগ লিখিতভাবে না এলে তা যাচাই-বাছাই করা সম্ভব নয়। তাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিচারকদের বিরুদ্ধে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
আইন বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য মেলেনি
পদায়ন নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এবং বিচারকদের অতীত রেকর্ড যাচাইয়ের বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, অতিরিক্ত সচিব খাদেম উল কায়েস এবং আইনমন্ত্রীর একান্ত সচিব সাজ্জাদুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়।
তবে তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফলে সাম্প্রতিক পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের অতীত দায়িত্ব, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং ৫ আগস্টের পর তাদের সরিয়ে দেওয়ার কারণগুলো কতটা পর্যালোচনা করা হয়েছে—এ প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট হয়নি।

