দেশের বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ প্রায় থেমে গেছে বলে মনে হচ্ছে। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের বড় সুপারিশগুলোর বেশিরভাগই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। জুলাই সনদের কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছালেও এই পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। কারো পক্ষ থেকে কোন পরিবর্তন আনার ইচ্ছাও দেখা যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী করা, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো, আদালত বিকেন্দ্রীকরণ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনসহ বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বাস্তবায়নে ধীরগতির বিষয় নয়। বরং যে সামান্য অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল। বর্তমান সরকার পরে সেগুলো বাতিল করেছে।
এপ্রিল মাসে সংসদ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বাতিল করে। এতে বিচার বিভাগ সংস্কারের দায়িত্ব ও ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারও আরও অন্তত ছয়টি বড় সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি। এসব সুপারিশ অধ্যাদেশের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল।
এর মধ্যে ছিল বিচারকদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ, স্বাধীন অপরাধ তদন্ত সংস্থা গঠন, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস চালু এবং মোবাইল কোর্টের কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা বাতিল করা। মোবাইল কোর্টকে শুধু আর্থিক জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।
আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। সংসদ না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না বলে আইন বিশেষজ্ঞরা জানান।
এসবের মধ্যে ছিল দণ্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা, বিভাগীয় শহরে স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ ও উপজেলা আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ, আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ, আপিল বিভাগে বিচারকের সংখ্যা কমপক্ষে সাতজন নির্ধারণ এবং বিচারকদের অবসরের বয়স ৭০ বছর করা।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, জুলাই সনদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর মতো বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের কয়েকটি সুপারিশ রাখা হয়েছে।
তিনি আরোও বলেন, তবে বাস্তবায়ন ছিল সীমিত ও অসম। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো সমাধান হয়নি।
এছাড়া ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বাস্তবায়নে ধীরগতির বিষয় নয়। বরং যে সামান্য অগ্রগতি হয়েছিল, তার কিছু অংশও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, কমিশন যে মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছিল, সেগুলোর মধ্যে অধস্তন আদালতের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব, বিচারক নিয়োগ, প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়গুলো এখনো বড় অংশে অমীমাংসিত।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার তামিম হোসেন শাওনও অগ্রগতির অভাব এবং সরকারের দুটি অধ্যাদেশ বাতিলের ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেন।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া কিছু আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কার বর্তমান সরকার চালিয়ে যাওয়ায় তিনি স্বাগত জানান। এর মধ্যে কয়েকটি আইনি সহায়তা উদ্যোগও রয়েছে।
ফৌজদারি কার্যবিধি এবং দেওয়ানি কার্যবিধির সংশোধনও এখনো কার্যকর রয়েছে। বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। এটি প্রথমে অধ্যাদেশের মাধ্যমে চালু করা হয়েছিল। পরে তা আইনগত কাঠামোর অংশ করা হয় বলে তামিম জানান।
ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনের মাধ্যমে মিথ্যা মামলায় ম্যাজিস্ট্রেটদের জরিমানার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সুরক্ষাও বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তারের নথি তৈরি, পুলিশের পরিচয় প্রকাশ, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি জবাবদিহিও বাড়ানো হয়েছে।
সংশোধনীর মাধ্যমে মামলার শুনানি মুলতবি করার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন বেশি মামলা নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিচার বিভাগের বড় সংস্কারগুলোর বেশিরভাগই বিশেষ করে বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, আপিল বিভাগের বিচারকের ন্যূনতম সংখ্যা এবং বিচারকদের অবসরের বয়স সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত।
তার জানা মতে, এসব বিষয়ে এখনো কোনো আইনগত সংশোধন হয়নি। তবে প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয় বিবেচনা করতে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, যেসব সুপারিশ যুক্তিসংগত ও প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হবে, সেগুলো সংসদে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত আসলে অপেক্ষা করতে হবে। প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তিনি এ বিষয়ে আর মন্তব্য করতে চাননি।
১৩ জুলাই সংসদ সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করে। শুরুতে এই কমিটিতে ১২ সদস্য ছিলেন। বিরোধীদের জন্য পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছিল।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান। তারা নীতিগতভাবে এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংস্কারগুলো বিবেচনা করা উচিত।
৫ আগস্ট কমিটি প্রথম বৈঠক করে। ওই বৈঠকে ক্ষমতাসীন বিএনপি বিরোধী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটকে প্রক্রিয়ায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়।
তবে বিরোধীদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপি একটি শর্ত দেয়। বিরোধী সংসদ সদস্যদের আগে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির কার্যক্রমে অংশ নিতে সম্মত হতে হবে।
২০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বৈঠকে কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের মতামত নিয়ে আলোচনা করে। আমন্ত্রণ জানানো ২৬টি দলের মধ্যে ১১টি বৈঠকে অংশ নেয়নি।
এরপর বিএনপি জানায়, পরিবর্তন একতরফাভাবে করা হবে না।
ব্যারিস্টার তামিম বলেন, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এখনো এগোয়নি। তাই সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত সুপারিশগুলোর কোনগুলো শেষ পর্যন্ত রাখা হবে এবং বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস এবং বিচারকদের প্রশিক্ষণ শক্তিশালী করতে জাতীয় বিচারিক একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চলছে।
বিচার ব্যবস্থা আধুনিক করার অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয় সারা দেশে আদালত ও বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে। কয়েকটি জেলায় ই-বেল বন্ড সেবাও চালু করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এর আগে এই পত্রিকাকে বলেছিলেন, বিচারক ও আদালতের কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ এবং অভিযোগ বাক্স চালু করার সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, সব পর্যায়ের বিচারকদের জন্য নির্দিষ্ট দুর্নীতিবিরোধী বিধানসহ নিয়ম তৈরি করতে হবে।
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন তাদের ৩৫১ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়।
প্রতিবেদনে কমিশন প্রতি তিন বছর পর বিচারকদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেয়। এসব হিসাব সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশের কথাও বলা হয়।
মামলা নিষ্পত্তি বাড়ানো এবং আদালত পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নত করতে যোগ্য ও সৎ অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাবও দেয় কমিশন।
মাহবুব উদ্দিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ এবং প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারত।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাকেব মাহবুব বলেন, বিচারক নিয়োগ, আপিল বিভাগের বিচারকের সংখ্যা, বিচারকদের অবসরের বয়স এবং দণ্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করার মতো পরিবর্তন শুধু সংবিধান সংশোধনের পরই করা সম্ভব।
তিনি বলেন, স্বাধীন অপরাধ তদন্ত সংস্থা ও স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার জন্য বড় বাজেট এবং প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে এসব উদ্যোগ শুরু করা যেত।
বিচারকদের সম্পদের হিসাব প্রতি তিন বছর পর অনলাইনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় ছয় মাসের মধ্যে স্বাক্ষর ও প্রকাশের মতো অন্যান্য সুপারিশ প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
সাকেব বলেন, বিচার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য সংবিধান সংশোধনের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিচারক, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো প্রয়োজন হবে।
এদিকে নিম্ন আদালতের বিচারকের সংখ্যা অন্তত ৬ হাজারে উন্নীত করতে প্রায় ৪ হাজার নতুন বিচারক নিয়োগ করতে হবে। বাজেট ও প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে এই কাজেও যথেষ্ট সময় লাগবে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে ৩ এপ্রিল তিনি এই পত্রিকাকে বলেছিলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো সরকার আরও পর্যালোচনা করবে এবং সংশোধিত আকারে সেগুলো ফিরিয়ে আনবে।
তিনি তখন বলেছিলেন, এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হবে না, এমনটা সরকার বলেনি। কিছু ভুল থাকায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করতে বিষয়টি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশগুলো আরও পর্যালোচনা ও সংশোধন করে পরে সংসদে বিল আকারে আনা হবে।

