মামলায় হাইকোর্ট থেকে খালাস পাওয়ার পরও প্রায় আট বছর কারাগারে থাকার অভিযোগে ইব্রাহিম শেখকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না কেন—জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে হাইকোর্টের খালাসের আদেশ কারা কর্তৃপক্ষকে জানাতে যাদের অবহেলা ও ব্যর্থতা ছিল, তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।
সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক এ রিট আবেদন করেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ হাসান শহীদ কারুজ্জামান।
আইনজীবী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক জানান, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বাসিন্দা ইব্রাহিম শেখ পেশায় নৈশপ্রহরী ছিলেন। ২০০৩ সালে রাতে দায়িত্ব পালন শেষে সকালে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের মামলায় তাকে আসামি করা হয়।
পরবর্তী সময়ে একটি মামলায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য একটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
এরপর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো ডেথ রেফারেন্স এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে করা জেল আপিলের শুনানি হয় হাইকোর্টে। ওই শুনানিতে মামলার সাক্ষ্য ও প্রমাণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি আদালতের নজরে আসে।
২০১৭ সালের ২০ জুলাই মৃত্যুদণ্ডের মামলায় ইব্রাহিম শেখকে খালাস দেন হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, তার বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ড বহাল রাখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। একই সময়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মামলাতেও তাকে খালাস দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ, হাইকোর্টের খালাসের আদেশের অনুলিপি প্রায় আট বছর ধরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে আদালত থেকে খালাস পাওয়ার পরও ইব্রাহিমকে কারাগারে থাকতে হয়।
দৈনিক যুগান্তরে ইব্রাহিম শেখের দীর্ঘ কারাবাস ও দুর্ভোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন আইনজীবী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক।
রিটকারী আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টে খালাস পাওয়ার পরও ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন ইব্রাহিম। তার দাবি, আদালতের খালাসের পরও এভাবে আটকে রাখা বেআইনি এবং এটি তার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।
আইনজীবী জানান, জীবনের প্রায় ২২ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন ইব্রাহিম শেখ। দীর্ঘ এই সময়ে তার মা মারা গেছেন এবং স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকার ফলে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও নিতে পারছেন না বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিটে ইব্রাহিম শেখের দীর্ঘ ও বেআইনি কারাবাসের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি পুনর্বাসনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া হাইকোর্টের খালাসের আদেশের পরও তাকে কারাগারে রাখার জন্য যেসব ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও ব্যর্থতা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

