দুর্নীতির মামলার তদন্তে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হকের নামে থাকা একটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ভিত্তিতে ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবিরের আদালত এই আদেশ দেন। এটি তদন্ত চলাকালীন সাময়িক ব্যবস্থা। মামলার অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ আদেশের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সংস্থার পক্ষে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
আবেদনে বলা হয়েছে, আনিসুল হকসহ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা অপরাধমূলক অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিজের ও স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নামে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১৪৬ কোটি ১৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৬ টাকার সম্পদ অর্জন করে দখলে রেখেছেন। একই মামলায় ২৯টি ব্যাংক হিসাবে ৩৪৯ কোটি ১৫ লাখ ২১ হাজার ৫৮২ টাকা জমা ও ৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ ৮১ হাজার ৬০৮ টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
দুদকের দাবি, তদন্তে আরও তথ্য মিলেছে। এজাহারভুক্ত আসামি আনিসুল হক এবং তদন্তে আসা আসামি মোহাম্মদ ইকবাল, শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম ও জেবুন্নেসা বেগম হকের নামে মোট ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এই চারজনের ২৩টি ব্যাংক হিসাবে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫২ টাকা জমা এবং ৩৬১ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার ১২৯ টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে বলেও আবেদনে বলা হয়েছে।
দুদক আরও দাবি করেছে, আসামিরা অবৈধ পথে ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া অর্থ তুলে নেওয়া, সরিয়ে ফেলা বা হাতছাড়া করার চেষ্টা করছেন। আবেদনে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে জেবুন্নেসা বেগম হকের নামের হিসাব অবিলম্বে অবরুদ্ধ করা দরকার। না করলে বিচারের সময় ওই অর্থ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা যাবে না। এতে রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
আদালত কেন এমন আদেশ দেন, তা বুঝতে অবরুদ্ধ করার উদ্দেশ্য দেখা দরকার। দুর্নীতির মামলায় বড় প্রশ্ন থাকে অর্থ উদ্ধারের। বিচার শেষ হতে অনেক বছর লাগতে পারে। এই সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি অর্থ তুলে নিলে বা সরিয়ে ফেললে চূড়ান্ত রায়ে বাজেয়াপ্তির আদেশ হলেও উদ্ধারযোগ্য কিছু থাকে না। তাই তদন্তকালে হিসাব স্থগিত রাখা একটি প্রচলিত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা। এটি শাস্তি নয়, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘোষণাও নয়। অভিযোগ প্রমাণ না হলে হিসাব আবার চালু হয়।
সংখ্যাগুলো সাজিয়ে দেখলে দুদকের যুক্তির ধরন বোঝা যায়। প্রথম হিসাবে ২৯টি ব্যাংক হিসাবে জমা ৩৪৯ কোটি টাকার বেশি, উত্তোলন ৩১৬ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ জমার প্রায় ৯১ শতাংশ তুলে নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় হিসাবে ২৩টি হিসাবে জমা ৩৭৫ কোটি টাকার বেশি, উত্তোলন ৩৬১ কোটি টাকার বেশি। এখানে জমার প্রায় ৯৬ শতাংশ উত্তোলিত। দুদক এই উচ্চ উত্তোলনের হারকেই সন্দেহজনক লেনদেন বলছে। তবে বাস্তবে এর ব্যাখ্যা ভিন্নও হতে পারে। ব্যবসায়িক লেনদেনে টাকা জমা ও তোলা স্বাভাবিক ব্যাপার। এই জমা ও উত্তোলন আসলে কী কারণে হয়েছে, তার প্রমাণ আদালতে আসবে।
প্রতিবেদনে সংখ্যার দুই ধরনের সেট এসেছে, যা একটু বিভ্রান্তিকর। মামলার শুরুতে সম্পদের পরিমাণ বলা হয়েছে ১৪৬ কোটি টাকার বেশি এবং হিসাব ২৯টি। তদন্তে পাওয়া তথ্যে সম্পদ ১৭২ কোটি টাকার বেশি এবং হিসাব ২৩টি। সম্পদের অঙ্ক প্রায় ২৬ কোটি টাকা বেড়েছে, আবার হিসাবের সংখ্যা কমেছে। কেন এই ফারাক, প্রতিবেদনে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। সম্ভবত প্রথম অঙ্ক মামলা দায়েরের সময়ের আর দ্বিতীয়টি তদন্তে পাওয়া হালনাগাদ তথ্য। তবে এটি অনুমান, নিশ্চিত নয়। আরেকটি পার্থক্য আসামির সংখ্যায়। প্রথম হিসাবে আনিসুল হকসহ মামলার আসামিদের কথা বলা হয়েছে, দ্বিতীয়টিতে চারজনের নাম আছে।
এই ঘটনায় জেবুন্নেসা বেগম হকের অবস্থানও লক্ষণীয়। তিনি এজাহারভুক্ত আসামি নন, বরং তদন্তে আসা আসামি। অর্থাৎ মামলা দায়েরের পর তদন্তকালে তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে। আইনি দিক থেকে এর অর্থ হলো, দুদক তদন্তে তাঁর নামে থাকা সম্পদ বা হিসাব সম্পর্কে অভিযোগযোগ্য তথ্য পেয়েছে বলে দাবি করছে। এই দাবি আদালতে যাচাই হবে। প্রতিবেদনে তাঁর বা তাঁর পরিবারের কোনো বক্তব্য নেই। তাই এ বিষয়ে তাঁদের অবস্থান জানা যায়নি। যে হিসাব অবরুদ্ধ হলো, সেটি কোন ব্যাংকে, কোন শাখায় এবং তাতে কত টাকা আছে, সে তথ্যও প্রতিবেদনে নেই।
আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, প্রতিবেদনের প্রায় সবটাই দুদকের আবেদনের ভাষ্যনির্ভর। আদালত আবেদনের যুক্তি মেনে আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু আদেশে আদালত নিজে কী পর্যবেক্ষণ করেছেন, তা জানানো হয়নি। আবেদনে আসামিরা অর্থ সরানোর চেষ্টা করছেন বলে যে দাবি করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা উদাহরণও প্রতিবেদনে নেই। এ ধরনের আবেদনে সাধারণত তদন্ত সংস্থা নিজের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরে। অন্য পক্ষের বক্তব্য ছাড়া একতরফা তথ্য দিয়ে পুরো চিত্র বোঝা কঠিন।
আনিসুল হকের বিরুদ্ধে এই মামলার বর্তমান অবস্থাও প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। মামলার নম্বর, দায়েরের তারিখ, কোন ধারায় অভিযোগ এবং তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, এসব তথ্য নেই। তাই ঘটনাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট মামলার তদন্ত পর্যায়ের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি দুদকের পরিচিত কৌশলের একটি উদাহরণ। অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ ও হিসাবও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। এতে ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের নামমাত্র মালিকানা আর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের ফারাক খোঁজার চেষ্টা বোঝা যায়। তবে পরিবারের সদস্যের নামে সম্পদ থাকা মানেই তা অবৈধ নয়। সেই সম্পদের উৎস বৈধ কি না, তা প্রমাণ করাই আইনি লড়াইয়ের মূল বিষয়। দুদককে প্রমাণ করতে হবে, ওই অর্থ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ এবং আসামির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও নিজেদের আয়ের বৈধ উৎস দেখানোর সুযোগ পাবেন।
সামনে কয়েকটি বিষয় নজরে রাখতে হবে। প্রথমত, আদেশের বিরুদ্ধে জেবুন্নেসা বেগম হক বা তাঁর আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে যান কি না। দ্বিতীয়ত, দুদক এই তদন্ত শেষ করে কবে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তৃতীয়ত, অন্য আসামিদের হিসাব ও সম্পদ নিয়ে আরও আদেশ আসে কি না। এসব ধাপ পেরোলেই বোঝা যাবে, অভিযোগগুলো আদালতে কতটা টিকছে এবং রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কতটা অর্থ উদ্ধার করতে পারছে।

