একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে কয়েকশ মানুষ সভা করছেন। হঠাৎ সেখানে আরেকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা হাজির হলেন। তারা অভিযোগ তুললেন- ভেতরে নিষিদ্ধ একটি দলের লোকজন গোপন বৈঠক করছে। এরপর পুলিশ এলো। কার্যালয় ঘিরে ফেলল। একে একে কয়েকশ মানুষকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। পরে যাচাই-বাছাই শেষে অধিকাংশকেই ছেড়ে দেওয়া হলো।
ঘটনাটিকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে পুলিশের অভিযান হিসেবে দেখলে হয়তো আসল প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যাবে।
আসল প্রশ্ন হলো, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কে আইন প্রয়োগ করবে? পুলিশ, নাকি ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক কর্মীরা?
গুলিস্তানের জাসদ কার্যালয়ে সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রায় ২৮০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। জাসদের বক্তব্য ছিল, সেখানে পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা চলছিল এবং প্রশাসনকে আগেই সভার বিষয়ে জানানো হয়েছিল। পুলিশের বক্তব্য ছিল, জাসদের আড়ালে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকজন গোপন বৈঠক করছে- এমন তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং ২৭ জনকে আদালতে পাঠানোর কথা জানা যায়।
এই তথ্যগুলো পাশাপাশি রাখলেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে- রাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য যদি এত বড় একটি অভিযানের ভিত্তি হয়, তাহলে সেই তথ্যের নির্ভুলতার দায় কে নেবে?
কারণ একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে কয়েকশ মানুষকে একসঙ্গে আটক করা কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলা অভিযান নয়। এটি রাষ্ট্রের শক্তির প্রকাশ। আর রাষ্ট্রের শক্তি যখন প্রয়োগ করা হয়, তখন ভুলের মূল্যও অনেক বেশি।
সন্দেহ কি গ্রেপ্তারের যথেষ্ট কারণ?
কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হলে রাষ্ট্র অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। নাশকতার পরিকল্পনা হলে সেটিও তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে। কিন্তু সন্দেহ আর অপরাধ এক জিনিস নয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গোয়েন্দা তথ্য তদন্তের সূচনা করতে পারে; কিন্তু সেই তথ্য নিজেই অপরাধের প্রমাণ হয়ে যায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোনো বৈধ রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে কারা ঢুকবে, কারা সভা করবে, কে কোন স্লোগান দেবে—এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।
সাম্প্রতিক ঘটনায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে লোকজন আটকে পুলিশকে খবর দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এমনকি পুলিশ আসার আগে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ও স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে।
এখানেই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সীমারেখাটি তৈরি হয়।
রাজনৈতিক কর্মী অভিযোগ করতে পারেন; কিন্তু তিনি পুলিশ হতে পারেন না।
রাজনৈতিক দল তথ্য দিতে পারে; কিন্তু তদন্ত করতে পারে না।
রাজনৈতিক কর্মী সন্দেহ প্রকাশ করতে পারেন; কিন্তু কাউকে আটক করার ক্ষমতা তার নেই।
এই সীমারেখা মুছে গেলে আজ যে ক্ষমতা এক দলের হাতে নিরাপদ মনে হচ্ছে, কাল সেটিই অন্য দলের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
‘জয় বাংলা’ কি অপরাধের প্রমাণ?
ঘটনাটির সঙ্গে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের প্রসঙ্গও এসেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই স্লোগান দেওয়ার খবর পাওয়ার পরও অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক আইনি প্রশ্ন রয়েছে।
কোনো স্লোগান কারও রাজনৈতিক পরিচয়ের ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু শুধু একটি স্লোগান শুনেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কি না- সেটি অবশ্যই আইনের প্রশ্ন।
রাষ্ট্র যদি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে, সেই নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট পরিধি কী- তা স্পষ্ট থাকা জরুরি। কোন কাজ অপরাধ, কোন কাজ নয়; কোন প্রতীক বা কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ, কোনটি নয়- এসব বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্বিচারতার সুযোগ তৈরি হয়।
আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখানেই।
কারণ আইনের ভাষা যদি অস্পষ্ট হয় এবং তার ব্যাখ্যা যদি পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী বদলে যায়, তাহলে নাগরিকের স্বাধীনতা নিরাপদ থাকে না।
আজ প্রতিপক্ষ, কাল আপনি
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো, ক্ষমতার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
যে দল ক্ষমতায় থাকে, সে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজের রাজনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে। আর বিরোধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিকে আইন প্রয়োগের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে চায়।
দুটিই বিপজ্জনক।
কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
সরকার পরিবর্তন হবে, দল পরিবর্তন হবে, রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তন হবে। কিন্তু পুলিশ, প্রশাসন, আদালত এবং আইন থাকবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হিসেবে।
আজ যদি একটি দলের কর্মী পুলিশের আগে গিয়ে কাউকে ‘অপরাধী’ শনাক্ত করেন, আগামীকাল অন্য কোনো দল একই যুক্তিতে অন্য কারও কার্যালয় ঘেরাও করতে পারে।
আজ যদি রাজনৈতিক পরিচয় দেখে একজনকে আটক করা বৈধ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, কাল সেই একই সংস্কৃতি ভিন্ন মতের সাংবাদিক, শিক্ষক, ছাত্র, নাগরিক কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর ওপরও নেমে আসতে পারে।
তখন প্রশ্ন থাকবে না – কোন দল ক্ষমতায়?
প্রশ্ন হবে, রাষ্ট্র কি এখনও আইনের অধীনে আছে?
গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় শিক্ষা
বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক পক্ষপাত এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
সেই অভিজ্ঞতার পর রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হওয়া উচিত ছিল- কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না।
কিন্তু যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গায় নতুন রাজনৈতিক শক্তি এসে একই ধরনের আচরণ শুরু করে, তাহলে শুধু মুখ বদলায়; রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না।
একসময় আমরা দেখেছি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের হাতে কতটা অস্বাভাবিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এখন যদি অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীরা পুলিশি কার্যক্রমের আগে গিয়ে ‘অভিযান’ পরিচালনার ভূমিকা নিতে শুরু করেন, তাহলে সেটিকে গণতন্ত্রের নতুন সংস্কৃতি বলা যাবে না।
ক্ষমতার পোশাক বদলালেই ক্ষমতার অপব্যবহার গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না।
পুলিশেরও একটি সীমা আছে
পুলিশের কাজ আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু পুলিশও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বড় ধরনের অভিযান চালানো হলে প্রশ্ন উঠবে—তথ্যটি কোথা থেকে এলো? যাচাই কীভাবে হলো? আটক করার আইনি ভিত্তি কী ছিল? কারা সত্যিই সন্দেহভাজন ছিলেন? কারা শুধু একটি সভায় উপস্থিত ছিলেন?
আর যদি শত শত মানুষকে নিয়ে গিয়ে অধিকাংশকেই অল্প সময়ের মধ্যে ছেড়ে দিতে হয়, তাহলে সেই প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এ ধরনের ঘটনায় তদন্তের প্রয়োজন শুধু আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নয়; অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিও পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে।
কারণ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে একজনকে আটক করা অন্যায় হতে পারে; কিন্তু ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকশ মানুষকে আটক করা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্নও বটে।
রাজনীতি থেকে পুলিশের দূরত্ব জরুরি
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার অস্ত্র নয়—তার নিরপেক্ষতার প্রতি মানুষের বিশ্বাস।
মানুষ যদি মনে করে পুলিশ কোনো দলের হয়ে কাজ করে, তাহলে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আবার রাজনৈতিক দল যদি মনে করে পুলিশের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে তারাও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে।
এই দুই প্রবণতা বন্ধ করার দায়িত্ব সরকারের।
সরকারের উচিত স্পষ্ট করে দেওয়া, কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী আইন হাতে তুলে নিতে পারবেন না। কোনো রাজনৈতিক কার্যালয়ে অভিযোগ থাকলে সেটি পুলিশকে জানাতে হবে। পুলিশ তদন্ত করবে। প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা হবে।
দল অভিযোগ করবে, রাষ্ট্র তদন্ত করবে – এই বিভাজনটিই গণতন্ত্রের নিরাপত্তাবলয়।
সংস্কার শুধু সংবিধানে নয়, আচরণেও
রাষ্ট্র সংস্কারের কথা অনেক বলা হয়েছে। কিন্তু সংস্কার মানে শুধু নতুন আইন, নতুন কমিশন কিংবা নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা নয়।
সংস্কারের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা হলো, ক্ষমতাসীন দলের কর্মী কি পুলিশের কাজ করতে পারবেন?
বিরোধী দলের কার্যালয়ে ঢুকে কাউকে আটকে রাখা যাবে কি?
গোয়েন্দা তথ্যের নামে শত শত মানুষকে আটক করার পর ভুল প্রমাণিত হলে তার জবাবদিহি হবে কি?
একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয় কি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে যেকোনো সময় তল্লাশির আওতায় চলে যাবে?
এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর দরকার।
প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়, সভা ও সমাবেশে পুলিশের হস্তক্ষেপের জন্য লিখিত ও স্বচ্ছ প্রটোকল তৈরি করা যেতে পারে। জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া রাজনৈতিক সভায় অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনুমোদন, লিখিত কারণ সংরক্ষণ এবং পরবর্তী স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
একইভাবে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জন্যও একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন – কেউ আইন হাতে নিলে দলীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাষ্ট্রের শক্তি দেখানোর চেয়ে রাষ্ট্রের সীমা জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ
একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে এমন রাষ্ট্র নয়, যে কয়েকশ মানুষকে একসঙ্গে আটক করতে পারে।
শক্তিশালী রাষ্ট্র হলো সেই রাষ্ট্র, যে জানে কখন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে এবং কখন ক্ষমতা প্রয়োগ না করাই আইনের দাবি।
একটি গণতান্ত্রিক সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে শক্তিশালী হয় যেখানে প্রতিপক্ষও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পায়।
কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, আজ আপনি ক্ষমতায়, কাল অন্য কেউ। কিন্তু পুলিশ, আদালত, আইন ও রাষ্ট্র তখনও থাকবে।
সুতরাং জাসদ কার্যালয়ের ঘটনাকে শুধু একটি দিনের পুলিশি অভিযান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ভেতরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের একটি বড় প্রশ্ন লুকিয়ে আছে—
আমরা কি সত্যিই এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে অপরাধীকে আইন শনাক্ত করবে; নাকি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরতে চাই, যেখানে দল আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করবে, তারপর রাষ্ট্র তার পেছনে দাঁড়াবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের নয় – সব রাজনৈতিক দলেরও দিতে হবে।
কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক পতন শুরু হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক আনুগত্য আইনের চেয়ে বড় হয়ে যায়।
আর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পুনর্জন্ম ঘটে তখনই, যখন ক্ষমতাবান মানুষও বুঝতে শেখে—
আইন আমার দলের নয়; আইন রাষ্ট্রের।
পুলিশ আমার দলের নয়; পুলিশ রাষ্ট্রের।
আর রাষ্ট্র- কোনো দলের নয়, নাগরিকের।

