গত বুধবার সকালে মিরপুর ১০ নম্বরে হাজার হাজার মানুষ চাইছিলেন একটাই জিনিস: কাজে যাওয়ার জন্য একটু খালি রাস্তা। একই সময়ে শত শত হকার চাইছিলেন সমান সহজ একটা জিনিস: কেনাবেচার একটু জায়গা। দুপুর গড়াতেই দেখা গেল, কোনো পক্ষই নিজের চাওয়া পায়নি।
কী ঘটেছিল
৩০ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হোপ মার্কেট এলাকার ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নামে। কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হকার ও সিটি করপোরেশনের কর্মীরা মুখোমুখি হন, পুলিশও ঘটনাস্থলে ছুটে আসে।
ডিএনসিসির অন্তত তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন ধরে যায়। কেউ পুলিশের একটি গাড়ি ও একটি ভেকু ভাঙচুর করে। কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশ ৩০ জনকে আটক করে। অন্য একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী চারটি মামলায় ২৫ জন গ্রেপ্তার হন। মিরপুর ১০ থেকে মিরপুর ১৪ পর্যন্ত যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ে।
আগুন কীভাবে লাগল, তা নিয়ে বিবরণ একরকম নয়। একটি প্রতিবেদনে শর্টসার্কিটের কথা আছে। অন্যরা হকারদের দায়ী করছেন। অভিযানের আগে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং হকারদের মালামালের কী হলো, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন জানিয়েছেন, অভিযান চলবে।
ফুটপাত হাঁটার মানুষের
মিরপুর ১০ নম্বরে অফিস ছুটির সময় একবার হেঁটে দেখুন। মা সন্তানের হাত ধরে রাস্তায় নেমে যান। বৃদ্ধ মানুষ ফাঁক খোঁজেন, কিন্তু ফাঁক পান না। অফিসযাত্রী রিকশা আর বাসের মাঝখান দিয়ে পথ করে নেন, কারণ ফুটপাতে পা রাখার জায়গা নেই।
সিটি করপোরেশনের যুক্তি তাই ফেলনা নয়। ফুটপাত পথচারীর জন্য। দোকান সেখানে জায়গা দখল করলে হাঁটা মানুষ নিজের নিরাপত্তা দিয়ে দাম চোকায়।
ছোট দোকান মানে একটা পরিবারের হাঁড়ি
এবার হকারের দিকটা দেখুন। দিনে কয়েকশ টাকা বিক্রি দিয়ে তিনি ভাত কেনেন, সন্তানের স্কুলের খরচ চালান, ওষুধ আনেন। অনেক হকার বাকিতে মাল তোলেন। একদিনের বিক্রি বন্ধ হলে ঘাটতি পড়ে। দোকান উঠে গেলে সংসার ভেঙে পড়ে।
এ কারণেই ক্ষোভটা এত গভীর। সিটি করপোরেশন দেখে একটা অবৈধ দোকান। হকার দেখেন আজ রাতের খাবার।
পুরোনো প্রতিশ্রুতি, এখনও অপূর্ণ
এই সংঘর্ষ হঠাৎ করে আসেনি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তৎকালীন ডিএনসিসি প্রশাসক ঘোষণা দেন, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা থেকে অবৈধ হকার ও অটোরিকশা সরানো হবে। একই সঙ্গে তিনি পুনর্বাসনের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির এবং বিকল্প ব্যবস্থা গড়ার আশ্বাস দেন।
এরপর এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। হকাররা আজ উচ্ছেদের মুখে, আর সেই বিকল্প ব্যবস্থা দেখার জন্য সবাই এখনও অপেক্ষায়।
আইন কাদের জন্য
সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও আইনের আশ্রয়ের অধিকার দিয়েছে। পেশা বা ব্যবসার স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকারও দিয়েছে। আবার রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত সীমা টানতে পারে। চলাচলের স্বাধীনতাও সবার জন্য সংবিধানে সুরক্ষিত, যা পথচারীর পক্ষে জোরালো যুক্তি।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ সড়ক ও ফুটপাতের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে দিয়েছে। ১৯৯৯ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্র বনাম বাংলাদেশ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ জীবিকাকে জীবনের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আদালত পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন, কিন্তু বৈধ উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করেননি।
সহজ ভাষায় বললে, সিটি করপোরেশন ফুটপাত খালি করতে পারে, তবে ন্যায্য প্রক্রিয়া মানতে হবে। কোনো পক্ষ সহিংসতা করলে সেই পক্ষের যুক্তি দুর্বল হয়ে যায়। এই লেখা আইনি পরামর্শ নয়। আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
হকার কমলেই কি ঢাকা ঠিক হবে?
না, এতে ঢাকা ঠিক হবে না। হকাররা ঢাকার সবচেয়ে চোখে পড়া সমস্যা, কিন্তু যানজট, দুর্বল গণপরিবহন, বায়ুদূষণ আর জলাবদ্ধতা তাঁরা তৈরি করেননি। ফুটপাতের সস্তা পণ্য নিম্ন আয়ের মানুষ ও পোশাকশ্রমিকের চাহিদা মেটায়। দোকান সরালে সেই চাহিদা শেষ হয় না, আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফুটপাতে দোকান আবার ফিরে আসে।
অনেক শহর ভিন্ন পথ নিয়েছে। তারা হকারদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা ঠিক করেছে, বেচাকেনার সময় বেঁধে দিয়েছে, লাইসেন্স দিয়েছে এবং বাজারের জায়গা বানিয়েছে। এসবে টাকা ও পরিকল্পনা লাগে, তবে বুধবারের মতো সংঘর্ষের ক্ষতির চেয়ে সেই খরচ কম।
ঢাকার দরকার মুক্ত ফুটপাত। ঢাকার আরও দরকার, মানুষ যেন সম্মানের সঙ্গে রোজগার করতে পারেন। দুটোই সম্ভব, তবে উচ্ছেদের আগে পরিকল্পনা করতে হবে। তা না হলে প্রতিটি অভিযানের শেষ দৃশ্য একই থাকবে: বন্ধ রাস্তা, পোড়া গাড়ি আর বিক্রি করার মতো কিছুই নেই এমন এক হকার।

