নিজের একখণ্ড জমি বা একটি ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখেন প্রায় সবাই। কিন্তু কিনতে গেলেই শুরু হয় খরচের হিসাব। দলিল নিবন্ধনের সময় ক্রেতাকে একসঙ্গে অনেক ফি ও কর দিতে হয়। স্ট্যাম্প শুল্ক, নিবন্ধন ফি, স্থানীয় সরকার কর ও উৎসে আয়কর মিলিয়ে অঙ্কটা অনেকের কাছে বোঝা মনে হয়। এই চাপ থেকেই অনেকে দলিলে আসল দামের চেয়ে কম মূল্য দেখানোর পথ বেছে নেন।
বিভিন্ন সরকারি ফি এখন কত, তা সাধারণ ক্রেতার জানা থাকা দরকার। দলিলের মূল্যের ওপর নিবন্ধন ফি ১ শতাংশ ও স্ট্যাম্প শুল্ক ১.৫ শতাংশ। এর সঙ্গে যোগ হয় স্থানীয় সরকার কর। জমির অবস্থানভেদে উৎসে কর ১ শতাংশ বা ২ শতাংশ হতে পারে। সব মিলিয়ে এলাকাভেদে খরচ আলাদা হয়। বিক্রেতার মূলধনি মুনাফা কর যোগ হলে মোট চাপ আরও বাড়ে। ডেভেলপারের কর যুক্ত হলে ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে খরচ আরও বেশি হয়।
এখানে বড় ভূমিকা রাখে মৌজা রেট। সরকার প্রতিটি এলাকার জমির একটি সর্বনিম্ন মূল্য ঠিক করে দেয়। এর নিচে দলিল করা যায় না। কিন্তু অনেক এলাকায় এই রেট বাজারদরের চেয়ে অনেক কম। আবার কিছু এলাকায় বাজারদরের চেয়ে বেশিও দেখা যায়। কম রেটের এলাকায় ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনেই কর বাঁচাতে মৌজা রেটেই দলিল করেন। ফলে সরকারি খাতায় লেনদেনের আসল চিত্র ওঠে না।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ধরা যাক, একজন পাঁচ কোটি টাকার সম্পত্তি বেচে দলিলে দেখালেন দুই কোটি। পরে তিনি সাত কোটি টাকার আরেকটি সম্পত্তি কিনে দলিলে দেখালেন চার কোটি। মাঝের তিন কোটি টাকার কোনো হিসাব রাষ্ট্রের নথিতে থাকল না। সরকার ন্যায্য কর পেল না। অথচ আইন ভঙ্গের ঝুঁকিটা থেকে গেল ওই ক্রেতার ঘাড়েই।
আইনের ঝুঁকি
আইনের দিক থেকে কম ঝুঁকি কম নয়। রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ অনুযায়ী একশ টাকার বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তর নিবন্ধিত দলিল ছাড়া বৈধ হয় না। স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯ অনুযায়ী দলিলে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্যসহ কর নির্ধারণের সব তথ্য সঠিকভাবে লিখতে হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে কম মূল্য দেখালে কম দেওয়া স্ট্যাম্প শুল্কের সঙ্গে জরিমানাও গুনতে হতে পারে। মিথ্যা ঘোষণা দিলে ফৌজদারি দায়ের সুযোগও থাকে। তাই কর বাঁচানোর এই সহজ পথ অনেক সময় ভবিষ্যতে বড় বিপদ ডেকে আনে।
আয়কর আইনের দিকটিও ক্রেতাকে মাথায় রাখতে হবে। সম্পত্তি কেনার টাকার উৎস কী, তা কর কর্তৃপক্ষ জানতে চাইতে পারে। দলিলে কম দেখিয়ে বাকি টাকা নগদে দিলে সেই টাকার হিসাব দেখানো কঠিন হয়ে পড়ে। পরে সম্পদ বিবরণীতে সম্পত্তির মূল্য কম দেখানো থাকলে বিষয়টি আরও জটিল হয়। বিক্রির সময় দলিলের মূল্যই হবে আপনার কেনা দাম। সেই দাম কম থাকলে বিক্রির সময় আপনার মুনাফা কাগজে অনেক বেশি দেখাবে। ফলে তখন বেশি কর দিতে হতে পারে।
এর বাইরেও সমস্যা আছে। ব্যাংক ঋণ নেওয়ার সময় সম্পত্তির মূল্যায়ন দলিলের মূল্যের ওপর নির্ভর করে। দলিলে দাম কম থাকলে কাঙ্ক্ষিত ঋণ পাওয়া যায় না। ভবিষ্যতে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ হলে আদালতে আপনার দাবি দুর্বল হতে পারে। জমি অধিগ্রহণ হলে ক্ষতিপূরণও অনেক সময় রেকর্ডে থাকা মূল্যের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ আজ কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে কাল অনেক বেশি হারাতে পারেন।
সমাধান কী?
প্রথম কাজ মৌজা রেটকে ডিজিটালাইজ করা। বছরের পর বছর একই রেট ধরে রাখলে বাজারের সঙ্গে ফারাক বাড়তেই থাকে। সরকারের উচিত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা। সেখানে এলাকার অবস্থান, অবকাঠামো, জমির ব্যবহার ও বার্ষিক ভাড়ার মতো তথ্য থাকবে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার কাছে প্রতিটি হোল্ডিংয়ের তথ্য থাকে। সেই তথ্য কাজে লাগানো যায়। প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর নমুনা জরিপ করে রেট হালনাগাদ করলে বাজারের কাছাকাছি থাকা সম্ভব।
তবে শুধু রেট বাড়ালে সাধারণ মানুষের চাপ আরও বাড়বে। তাই একই সঙ্গে নিবন্ধন খরচ কমানো জরুরি। নিবন্ধন খরচকে বর্তমানের ১০ থেকে ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে এক-তৃতীয়াংশে (যেমন: ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে) নামিয়ে আনা হলে অর্থ বাঁচাতে গিয়ে কেউ নিজের সম্পদ লুকানোর চিন্তা করবে না। অর্থনীতিবিদদের একটি পরিচিত যুক্তি আছে। করের হার বেশি হলে মানুষ কর ফাঁকির দিকে ঝোঁকে। হার সহনীয় হলে কর দিতেই আগ্রহ বাড়ে।
সরকারও এ বিষয়ে ভাবছে বলে আগে খবর এসেছে। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকার জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ফি ও করহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা করছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, মৌজা মূল্যকে বাজারমূল্যের সঙ্গে মেলানোর উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব। তাদের আশঙ্কা, রেট হঠাৎ বেড়ে গেলে বাজারে চাপ পড়বে। এই উদ্বেগও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
তাই ধাপে ধাপে এগোনোই বাস্তবসম্মত পথ। প্রথমে কর ও ফি কমাতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে মৌজা রেট বাজারের কাছাকাছি আনতে হবে। এতে সাধারণ মানুষ সহজে সম্পত্তি কিনতে পারবে। রাষ্ট্রও ন্যায্য রাজস্ব পাবে। আবাসন খাতে লুকিয়ে থাকা অর্থ ধীরে ধীরে মূল স্রোতে ফিরবে। তখন লেনদেন হবে স্বচ্ছ, আর ক্রেতার ঝুঁকিও কমবে।
আজ যাঁরা জমি বা ফ্ল্যাট কিনছেন, তাঁদের জন্য কিছু সতর্কতা জরুরি। দলিল করার আগে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন। সম্পত্তির মালিকানার ধারাবাহিক কাগজপত্র যাচাই করুন। খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ দেখে নিন। সব ফি ও করের হিসাব নিবন্ধন অধিদপ্তর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা মিলিয়ে করুন। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করুন এবং প্রতিটি লেনদেনের প্রমাণ রাখুন। এতে আজকের ঝামেলা কমবে, আগামী দিনের নিরাপত্তাও বাড়বে।

