চাকরি বাঁচাতে মুসলিম তরুণকে জমি দিলেন হিন্দু প্রতিবেশী, উঠছে আইনি প্রশ্ন
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার এক ঘটনা এখন আলোচনায়। এক মুসলিম তরুণ সোনালী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চাকরি পাওয়ার পর শুরু হয় ভেরিফিকেশন। তখন দেখা যায়, তাঁর বাবার নামে কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই। পরিবারটি অনেক বছর ধরে ভাড়া বাসায় থাকে। এতে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিষয়টি জানতে পারেন এক হিন্দু প্রতিবেশী। তিনি নিজের জমি থেকে এক শতক জমি ওই তরুণকে দান করেন। কোনো টাকা নেননি। রেজিস্ট্রেশনের খরচও নিজে দিয়েছেন। রবিবার ৪ অক্টোবর জুড়ী উপজেলার সাবরেজিস্ট্রার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সরকারি বিধিমালা না জানা পর্যন্ত তিনি দাতা ও গ্রহীতার নাম প্রকাশ করেননি।
ঘটনাটি মানবিকতার একটি সুন্দর উদাহরণ। কিন্তু এর পেছনে একটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। চাকরি পেতে হলে কি সত্যিই জমি বা বাড়ি থাকতে হয়? যদি থাকতে হয়, তাহলে কোন আইনে বা কোন বিধিতে তা লেখা আছে? এই প্রশ্নের সোজা উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তাই লাখো চাকরিপ্রার্থী ও তাঁদের পরিবার দুশ্চিন্তায় থাকেন।
আগে একটি পুরোনো ঘটনা দেখা যাক। কয়েক বছর আগে রাজশাহীর আসপিয়া পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পান। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা পাবনায়। কিন্তু পরিবার সেখানকার জমি বিক্রি করে রাজশাহীতে থাকত। পুলিশ যাচাইয়ে গিয়ে পাবনায় তাঁদের কোনো বাড়িঘর পায়নি। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি চাকরি পান।
ওই সময় প্রথম আলো ও বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের মত উঠে আসে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা বলেন, জমি বা বাড়ি থাকতেই হবে, এমন কোনো বিধান তাঁদের জানা নেই। তাঁরা বলেন, বিধিতে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার কথা আছে। কিন্তু স্থায়ী স্থাপনা না থাকলে চাকরি হবে না, এমন কথা কোথাও নেই। মূল শর্ত হলো বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া।
এখানে সংবিধানের কথা মনে রাখা জরুরি। সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান সুযোগ থাকবে। ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কাউকে বৈষম্যের শিকার করা যাবে না। ২৮ অনুচ্ছেদেও একই ধরনের সুরক্ষা আছে। তাই সম্পত্তি নেই বলে কাউকে চাকরির অযোগ্য ধরা সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে মেলে না।
তাহলে ভেরিফিকেশনে জমি কেন খোঁজা হয়? এর পেছনে মূলত একটি অভ্যাস কাজ করে। স্থায়ী ঠিকানা যাচাই করতে অনেক জায়গায় দেখা হয়, সেখানে বাড়ি বা জমি আছে কি না। এটি প্রমাণের একটি সহজ পথ হিসেবে চালু হয়েছে। কিন্তু এটিই একমাত্র পথ নয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী যাচাইয়ের আরও উপায় আছে। কেউ ভূমিহীন হলে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে সনদ নিয়েও চাকরির সুযোগ পেতে পারেন।
জুড়ীর ঘটনায় আরেকটি আইনি দিকও আছে। স্থাবর সম্পত্তি দান করতে হলে লিখিত দলিল লাগে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৯০৮ নয়, ১৮৮২ সালের আইন অনুযায়ী দানপত্রে দাতার সই থাকতে হয়। কমপক্ষে দুজন সাক্ষীও লাগে। আবার রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী এই দলিল নিবন্ধন করাতে হয়। দাতা হিন্দু আর গ্রহীতা মুসলিম হলে আইনে কোনো বাধা নেই। ধর্ম ভিন্ন হলেও দান বৈধ থাকে।
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। একজন তরুণকে চাকরি বাঁচাতে অন্যের দান নিতে হলো কেন? সবাই তো এমন প্রতিবেশী পান না। যাঁর পরিবার ভাড়া বাসায় থাকে, তাঁর কী হবে? যাঁর বাবা দিনমজুর, তাঁর কী হবে? যোগ্যতা থাকলেও যদি জমির কাগজ না থাকার কারণে কেউ বাদ পড়েন, তাহলে সেটি অন্যায্য। এতে গরিব ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এখন প্রয়োজন পরিষ্কার নির্দেশনা। সরকারের উচিত জানানো, স্থায়ী ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য কোন কোন কাগজ গ্রহণযোগ্য। জাতীয় পরিচয়পত্র, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলরের সনদ, ভোটার তালিকা বা অন্য প্রমাণ কেন যথেষ্ট নয়, তাও বলা দরকার। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও যাচাইকারী সংস্থাকে একই নিয়ম মানতে হবে। তাহলে কোনো প্রার্থীকে আর আতঙ্কে থাকতে হবে না।
জুড়ীর এই প্রতিবেশীর উদারতা প্রশংসার যোগ্য। তিনি ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে একজন তরুণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু একজন মানুষের উদারতার ওপর ভর করে সবার চাকরি টিকে থাকতে পারে না। সেখানে দরকার স্পষ্ট নিয়ম ও সমান আচরণ। চাকরি পাওয়ার অধিকার যোগ্যতার ওপর দাঁড়াবে, জমির দলিলের ওপর নয়।

