কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রির পর ক্রেতাকে রসিদ না দিলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা, কিংবা দুটিই হতে পারে। ‘ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় এমন বিধান রাখা হয়েছে। খসড়ায় নকল ও ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। নিষিদ্ধ পণ্য ও অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও শাস্তির প্রস্তাব আছে।
২০০৯ সালের ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমানে খসড়াটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া হচ্ছে। চূড়ান্ত রূপ পেলে নতুন বিধান কার্যকর হবে।
সংশোধনীতে নতুন ৫৩ক ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো বিক্রেতা পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি করে ক্রেতা বা সেবাগ্রহীতাকে রসিদ না দিলে তিনি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। প্রস্তাব কার্যকর হলে রসিদ না দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
এই বিধান যুক্ত করার কারণ ব্যাখ্যা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মতে, বিক্রয় রসিদ লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। পণ্যের দাম, বিক্রেতা ও লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ে এর বড় ভূমিকা আছে। কোনো অভিযোগ উঠলে বিক্রেতার দায় নির্ধারণেও রসিদ প্রমাণক হিসেবে কাজ করতে পারে। এ কারণেই রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ।
বাস্তবে ক্রেতারা অনেক সময় রসিদ ছাড়াই কেনাকাটা করেন। ফলে ভেজাল বা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কিংবা ভুল দামের অভিযোগ করলেও তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। রসিদ বাধ্যতামূলক হলে ভোক্তার অভিযোগ জানানোর পথ সহজ হতে পারে।
খসড়ায় মোড়কজাত পণ্যের বিষয়েও কড়াকড়ির প্রস্তাব আছে। দেশে উৎপাদিত বা আমদানি করা মোড়কজাত পণ্যের গায়ে কিছু তথ্য স্পষ্টভাবে লিখতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে:
পণ্যের মাত্রা বা ওজন, পরিমাণ, ব্যবহারবিধি ও উপাদান। এর সঙ্গে থাকতে হবে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপাদন, প্যাকেটজাতকরণ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং মডেল বা ব্যাচ নম্বর। উৎপাদনকারী, মোড়কজাতকারী ও আমদানিকারকের নাম-ঠিকানাও উল্লেখ করতে হবে।
এসব তথ্য বাধ্যতামূলক জেনেও কেউ পণ্য বিক্রি করলে, বিক্রির প্রস্তাব দিলে বা বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রদর্শন করলে তা অপরাধ বলে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নকল ও ভেজাল পণ্যের ক্ষেত্রেও আইনের আওতা বাড়ছে। নকল পণ্য বা ওষুধের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন নয়, আমদানি, মজুত, সরবরাহ, বিক্রি কিংবা বিক্রির প্রস্তাবও ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কাজ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব আছে। ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রি ও বিক্রির প্রস্তাবের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের পরিধিও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এতে নকল ও ভেজালের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ আরও বিস্তৃত হবে।
অনলাইন বাণিজ্য নিয়েও নতুন বিধান আসছে। প্রস্তাবিত ৪১ক ধারায় ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্মের বিক্রেতা বা মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে আইনে নিষিদ্ধ কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই ধারায় অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ের আয়োজন করা কিংবা আয়োজনে সহায়তা করাও আনা হচ্ছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে।
সব মিলিয়ে খসড়াটি ভোক্তার সুরক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি বিক্রেতাদের দায়বদ্ধতাও বাড়াতে চায়। তবে আইনটি কার্যকর হলে ছোট দোকান ও ফার্মেসিতে রসিদ দেওয়ার চর্চা কতটা গড়ে ওঠে এবং তদারকি কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন। এ জন্য খসড়া নিয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সংগঠনের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

