হাম চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে সহজে প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলোর একটি। দুই ডোজ টিকা নিলে বেশির ভাগ শিশু এ রোগ থেকে রক্ষা পায়। তবু চলতি বছরের মার্চ থেকে সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্নটা তাই শুধু রোগ নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, এই ঝুঁকি কি আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, আর রাষ্ট্র কি তা ঠেকাতে যথেষ্ট করেছে? রাষ্ট্রের দায় কি? এ দায় কি রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে?
টিকাদানের হারে বড় ধস
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে টিকার হারের দিকে তাকাতে হবে। ২০২১ সালেও দেশে টিকাদানের হার ছিল প্রায় ৯৯.৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৫৬ থেকে ৫৯ শতাংশে। অথচ সংক্রমণের চেইন ভাঙতে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। হার এত নিচে নামলে প্রাদুর্ভাব ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
হাইকোর্টের রুল: এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ কেন নয়
এই পরিস্থিতিতে আদালত নড়েচড়ে বসেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একটি রুল জারি করেছে। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, হামে মারা যাওয়া এক শিশুর পরিবারকে কেন এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না। এটি এখনো চূড়ান্ত রায় নয়। রুলের জবাব ও শুনানির পরই আদালত সিদ্ধান্ত দেবে। তবে এই রুল থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি এখন আইনি জবাবদিহির পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব
সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে চিকিৎসাসহ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলা হয়েছে। ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নতিকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য বলা হয়েছে। কিন্তু এ দুটি অনুচ্ছেদ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ। ৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মূলনীতি আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যায় না। অর্থাৎ কোনো নাগরিক টিকাকে সরাসরি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে দাবি করে আদালতে যেতে পারেন না।
তবে একটি পথ খোলা আছে। ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার সুরক্ষিত। আমাদের আদালত দীর্ঘদিন ধরে এর ব্যাখ্যা দিয়ে আসছে। সেই ব্যাখ্যায় জীবনের অধিকার মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়। এর মধ্যে আছে এমন হুমকি থেকে সুরক্ষা, যা আগে থেকে বোঝা যায় এবং যা ঠেকানো সম্ভব। হামের মৃত্যুর ক্ষেত্রে আইনি লড়াইয়ের মূল ভিত্তি এখানেই।
আইনি দৃষ্টিকোণ: কীভাবে আদালত পর্যন্ত যাওয়া যায়
এখানে একটি বিষয় জানা জরুরি। মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে রিট করা যায়। জনস্বার্থে দায়ের করা মামলায় ভুক্তভোগী পরিবারের বাইরের কেউও আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। আগে কিছু মামলায় মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের কারণে আদালত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে। তাই হামের মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের রুল আইনের পরিচিত পথ ধরেই এসেছে। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের গাফিলতি প্রমাণ করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
২০১৮ সালের আইনে কী আছে, কী নেই
সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ এ বিষয়ে দেশের প্রধান আইন। এর ৪ ধারায় সংক্রামক রোগের একটি তালিকা আছে। এটি চূড়ান্ত তালিকা নয়। সরকার গেজেট জারি করে নতুন বা ফিরে আসা রোগকেও এই আইনের আওতায় আনতে পারে। আইনে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে সন্দেহভাজন সংক্রমণ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সংক্রমিত এলাকা ঘোষণা করা এবং ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও তাদের।
আইনের ২৫ ও ২৬ ধারায় শাস্তির বিধান আছে। কেউ সংক্রমণের কথা লুকালে বা আইনের অধীন প্রশাসনিক আদেশ না মানলে তাঁকে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু আইনে টিকার ন্যূনতম মজুত রাখার কথা নেই। টিকার সংকট দেখা দিলে তা জানানো বাধ্যতামূলক, এমন বিধানও নেই। টিকাদানের ন্যূনতম হার কত হতে হবে, তাও ঠিক করা নেই। আইনের ৩২ ধারায় সরকার বিধি করতে পারে। তবু প্রাদুর্ভাবের মতো জরুরি পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে, তা কোথাও স্পষ্ট করা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকার ব্যর্থতা
হামের এই সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ফিরে যেতে হয়। বাংলাদেশ বহু বছর ইউনিসেফের মাধ্যমে হাম ও রুবেলার টিকা পেয়ে এসেছে। এর খরচের বড় অংশ দিত গ্যাভি, সঙ্গে থাকত সরকারের অংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে খোলা দরপত্রের পথে যায়। এই সিদ্ধান্তই পরে সংকটের কেন্দ্রে চলে আসে।
ইউনিসেফ এই পরিবর্তনে আপত্তি জানিয়েছিল। তারা জানিয়েছিল, নতুন পদ্ধতিতে পুরো কেনাকাটা বারো গুণ পর্যন্ত দেরি হতে পারে। একজন কর্মকর্তা সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে সরাসরি এ কাজ না করতে বলেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তার প্রতিদানে আমরা পেয়েছি হাজারের বেশি মৃত্যু।
ভারতের উদাহরণ
ভারতে ব্যবস্থাটা ভিন্ন। সেখানে মহামারী রোগ আইন ১৮৯৭ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৫ সরকারকে জনস্বাস্থ্যে স্পষ্ট জরুরি ক্ষমতা দিয়েছে। এ নিয়ে আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নজিরও আছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিজে থেকেই বিষয়টি হাতে নিয়েছিল। ২০২১ সালের সেই মামলার নাম ইন রি: ডিস্ট্রিবিউশন অব এসেনশিয়াল সাপ্লাইজ অ্যান্ড সার্ভিসেস ডিউরিং প্যানডেমিক।
লেখকের উল্লেখ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রচনা গাঙ্গু বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় আদালত আরও এক ধাপ এগিয়েছে। সরকারি জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির পর কেউ গুরুতর ক্ষতির শিকার হলে রাষ্ট্রের ইতিবাচক দায় তৈরি হয়, এমন মত দিয়ে আদালত দোষ প্রমাণ ছাড়া ক্ষতিপূরণের কাঠামো করতে বলেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।
জার্মানি: স্কুলে ঢুকতে লাগবে হামের টিকা
জার্মানি ২০২০ সালের মার্চ থেকে হাম প্রতিরোধ আইন কার্যকর করেছে। এই আইনে ডে কেয়ার ও স্কুলে ভর্তির আগে শিশুর হামের টিকার প্রমাণ দেখাতে হয়। শিক্ষক ও শিশুযত্ন কর্মীদেরও একই প্রমাণ দিতে হয়। নিয়ম না মানলে অভিভাবককে জরিমানা গুণতে হয়।
আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রের দায়
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমেও কিছু দায় নিয়েছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিইএসসিআর) ১২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে মহামারী ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। শিশু অধিকার সনদের (ইউএনসিআরসি) ২৪ অনুচ্ছেদে শিশুর সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করার কথা আছে। এগুলো সরাসরি আদালতে বলবৎ নাও হতে পারে। তবু রাষ্ট্রের আচরণ যাচাইয়ের একটি মানদণ্ড এগুলো দেয়।
আইনে কী পরিবর্তন দরকার
প্রথমতো, ২০১৮ সালের আইন সংশোধন করা জরুরি। সংশোধিত আইনে তিনটি বিষয় থাকা উচিত। প্রথমত, টিকার একটি ন্যূনতম মজুত থাকবে এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। দ্বিতীয়ত, টিকাদানের হারের একটি নির্দিষ্ট হার ঠিক করা হবে। তৃতীয়ত, দোষ প্রমাণ ছাড়া ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা চালু হবে।
উদ্দেশ্য এই নয় যে প্রতিটি প্রাদুর্ভাবের দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপাতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা যেইখানে দায়বদ্ধতা থাকবে। এর বিপরীতে সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া যায়। তাহলে পরের সংকটে রাষ্ট্র দুঃখ প্রকাশ নয়, কাজ দিয়ে জবাব দিতে পারবে।
তবে শেষ পর্যন্ত একটা প্রশ্ন থেকে যায় এত এত শিশুর মৃত্যু, এত এত মায়ের বুক খালির দায় কি রাষ্ট্রের উপর বর্তাবে না? বিগত সরকারের সিদ্ধান্তের কারনে যে ক্ষয় ক্ষতি হলো তাদের কি জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে না?

