কোনো জমির মালিকানা নিয়ে আইনি লড়াই চলতে থাকলে সেই জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। হাইকোর্ট সম্প্রতি এই রায় দিয়েছেন। আদালত জমির প্রকৃত মালিক ঠিক করার দায়িত্ব দিয়েছেন উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতকে। এই রায় শুধু দুই পক্ষের বিষয় নয়। যাঁরা জমি কেনেন, বায়না করেন বা উত্তরাধিকারে জমি পান, তাঁদের সবার জন্য এতে সতর্কবার্তা আছে।
শাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলায় বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের বেঞ্চ এই রায় দেন। গত ১৯ মে দুটি পৃথক রিট আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়। ২২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম। আইন বিষয়ক পোর্টাল বিডি ল পোস্টের তথ্য অনুযায়ী মামলা নম্বর ৩৮২০ ও ৩৮২১ অব ২০২১।
যে জমি নিয়ে বিরোধ
ফরিদপুরের ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ জমি নিয়ে এই বিরোধ। রায়ের তথ্য অনুযায়ী জমির মূল মালিক ছিলেন যমুনা চামার ও গয়ানাত চামার। হাত ঘুরে মালিক হন অনিল কুমার দত্ত। তিনি দানসূত্রে জমি দেন ছেলে অলোক কুমার দত্তকে। ১৯৯৬ সালের ৮ জুলাই অলোক কুমার দত্ত রেজিস্ট্রি করা বিক্রয় দলিলে জমি বিক্রি করেন শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে। তিনি দখলও বুঝিয়ে দেন।
অন্য পক্ষ মো. জাহিদুর রহমান। তাঁর দাবি, ১৯৯৬ সালের ২৩ মে অলোক কুমার দত্ত তাঁর সঙ্গে জমি বিক্রির বায়নাপত্র করেছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী জমি না পেয়ে তিনি ২০০১ সালে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার চেয়ে দেওয়ানি মামলা করেন। ওই মামলায় ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি একতরফা ডিক্রি পান। ২০০৩ সালে আদালতের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা দলিলও পান।
শাহাবুদ্দিন আহমেদ ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট এই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে ফরিদপুরের জেলা জজ আদালতে টাইটেল আপিল করেন। জেলা জজ দেরি মার্জনা করে আপিল শুনানির জন্য নেন। জাহিদুর রহমান এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করেন। হাইকোর্ট আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে নতুন শুনানির নির্দেশ দেন। ২০২৩ সালের ২৫ মে জেলা জজ আবার আপিল গ্রহণ করেন।
জাহিদুর রহমান ২০২৪ সালে আবারও সিভিল রিভিশন করেন। সেই মামলায় হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। মামলাটি এখনো হাইকোর্টে বিচারাধীন। অর্থাৎ ২০০১ সালের ডিক্রি টিকবে কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর আজও মেলেনি।
ট্রাইব্যুনাল থেকে হাইকোর্ট
জমিটি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় ছিল। তাই দুই পক্ষই জমি তালিকা থেকে ছাড়ানোর জন্য আলাদা মামলা করেন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। বিডি ল পোস্টের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল একটি মামলায় ছাড়ের পক্ষে ডিক্রি দেয় এবং অন্যটি খারিজ করে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আপীল ট্রাইব্যুনাল দুটি আপিলই মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল করে। এরপর বিষয়টি রিট আবেদন হয়ে হাইকোর্টে আসে।
শুনানিতে শাহাবুদ্দিনের আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া যুক্তি দেন, ২০০১ সালের মামলায় তাঁর মক্কেলকে পক্ষ করা হয়নি। তাই ওই ডিক্রি ও পরের দলিল তাঁর মক্কেলের ওপর কার্যকর নয়। তিনি আরও বলেন, আগের রেজিস্ট্রি দলিল পরের দলিলের ওপর প্রাধান্য পায়। জাহিদুরের আইনজীবী মো. নাসির শিকদার বলেন, বায়নাপত্র শাহাবুদ্দিনের দলিলের আগেই হয়েছে। তাঁর মতে আদালতের ডিক্রি ও দলিলের ভিত্তিতে মক্কেলের দাবি বৈধ।
হাইকোর্টের নির্দেশ
হাইকোর্ট বলেন, বায়নাপত্র এবং তা কার্যকরের জন্য করা ২০০১ সালের মামলার রায় ও ডিক্রি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শাহাবুদ্দিনের কেনা দলিলের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের মতে এসব প্রশ্ন সংক্ষিপ্ত রিট কার্যক্রমে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই আদালত নিজে কোনো পক্ষের স্বত্ব ঠিক করেননি।
আদালত চারটি নির্দেশ দিয়েছেন। জমির স্বত্ব ও মালিকানা আগে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে ঠিক হবে। তার আগে কারও অনুকূলে জমি অবমুক্ত করা যাবে না। চলমান আইনি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যে পক্ষের মালিকানা নির্ধারিত হবে, তাঁর নামে ফরিদপুরের ডেপুটি কমিশনার জমি অবমুক্ত করবেন। এর মধ্যে সব পক্ষকে দখলের বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।
আইন কী বলে
অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন ২০০১ (২০০১ সালের ১৬ নং আইন) এই বিরোধের মূল ভিত্তি। আইনের শুরুতেই বলা আছে, তালিকাভুক্ত কিছু সম্পত্তি বাংলাদেশি মূল মালিক, তাঁর উত্তরাধিকারী বা স্বার্থাধিকারীর কাছে ফেরত দেওয়া হবে। ধারা ৯ অনুযায়ী সরকার গেজেটে ক তফসিলের তালিকা প্রকাশ করে। তালিকার বাইরের জমি অর্পিত সম্পত্তি গণ্য হয় না। ২০১৩ সালের সংশোধনীতে খ তফসিল বাতিল হয়েছে।
তালিকায় থাকা জমির মালিক হতে চাইলে ধারা ১০ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হয়। ট্রাইব্যুনাল দেখে, আবেদনকারী জমির মালিক কি না এবং বাংলাদেশের নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দা কি না। আইনে আবেদনের সময়সীমা বাঁধা আছে। সময়মতো দাবি না করলে ধারা ২৬ অনুযায়ী জমি সরকারি সম্পত্তি গণ্য হয়। ধারা ১৩ বলে, তালিকা প্রকাশের দিনে আদালতে চলা এ ধরনের দেওয়ানি মামলা আপনাআপনি বাতিল গণ্য হয়। ধারা ৭ নতুন করে অন্য আদালতে মামলা করতে দেয় না। ২০২৩ সালের জুনে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ ধারা ৯, ১৩ ও ১৪ সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী নয় বলে রায় দিয়েছেন।
তবে ট্রাইব্যুনালের কাজেরও সীমা আছে। ধারা ১৭ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল শুধু এই আইনে নির্ধারিত প্রশ্নগুলোই নিষ্পত্তি করে। ধারা ১২ বলে, অবমুক্তির সিদ্ধান্ত নিজে থেকে আবেদনকারীর স্বত্ব বা দখল ঘোষণা করে না। ধারা ৮ বলে, অবমুক্তি বা প্রত্যর্পণের আগে সেই জমি বিক্রি, দান বা বন্ধক দিলে তা বাতিল ও ফলহীন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত এই কাঠামোর সঙ্গে মেলে। যে জমির স্বত্ব দেওয়ানি আদালতে ঝুলে আছে, তা ভুল ব্যক্তির নামে ছাড়লে পরে ঠিক করা কঠিন হয়। কারণ ধারা ১১ অনুযায়ী ডিক্রির পর ডিসিকে রেকর্ড অব রাইটস সংশোধন করে ডিক্রি প্রাপকের নাম বসাতে হয়।
আদালতে যে আইনি প্রশ্নগুলো উঠবে
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ এর ধারা ৫৪ অনুযায়ী বায়না মানে বিক্রির চুক্তি। এ বিষয়ের স্বীকৃত ভাষ্যগ্রন্থ অনুযায়ী এই নীতি ব্যাখ্যা করেছে যে বায়না নিজে জমিতে মালিকানা তৈরি করে না। বায়নার ক্রেতাকে চুক্তি কার্যকরের জন্য আদালতে যেতে হয়। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ এর ধারা ১২ এই মামলার সুযোগ দেয়। ডিক্রি পেলে আদালত বিক্রেতার পক্ষে দলিল করে দেন। রায়ের তথ্য অনুযায়ী জাহিদুর রহমান এই পথই নিয়েছেন।
সমস্যা তৈরি হয় পরের ক্রেতাকে নিয়ে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ধারা ২৭ এর খ দফা বলে, চুক্তির দাবি পরের ক্রেতার বিরুদ্ধেও খাটতে পারে। তবে যিনি মূল্য দিয়ে সরল বিশ্বাসে এবং আগের চুক্তির কথা না জেনে কিনেছেন, তিনি রক্ষা পেতে পারেন। শাহাবুদ্দিনের পক্ষ বলছে, তিনি ২০০১ সালের মামলার পক্ষই ছিলেন না। দেওয়ানি কার্যবিধির সাধারণ নীতি হলো, ডিক্রি মূলত মামলার পক্ষদের বাঁধে। এসব প্রশ্নের উত্তর হাইকোর্ট দেননি। দেওয়ানি আদালতকেই তা দেখতে হবে।
২০০৪ সালে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ধারা ৫৪ক এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে ধারা ২১ক যুক্ত হয়েছে। এখন বিক্রির বায়না লিখিত ও রেজিস্ট্রি করা না হলে আদালতে তা বলবৎ করা যায় না। বায়নার বাকি টাকাও আদালতে জমা দিতে হয়। এই মামলার বায়না ১৯৯৬ সালের। নতুন বিধান এখানে কীভাবে প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে হাইকোর্ট মত দিয়েছেন বলে জানা যায়নি।
রিটের এখতিয়ারেরও সীমা আছে। আপীল ট্রাইব্যুনালের রায় আইনে চূড়ান্ত (ধারা ২২ উপধারা ৩)। তাই ক্ষুব্ধ পক্ষ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে রিট করে। কিন্তু রিটে হাইকোর্ট সাধারণত বিতর্কিত তথ্য ও জটিল স্বত্বের প্রশ্ন নিষ্পত্তি করেন না। বিচারপতি মাহমুদুল ইসলামের কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশের মতো পাঠ্যবইয়েও রিট এখতিয়ারের এই সীমা আলোচিত। দলিল জাল কি না বা ডিক্রি বৈধ কি না, তা সাক্ষ্য ছাড়া ঠিক করা যায় না। সাক্ষ্য নেয় দেওয়ানি আদালত।
রায়ের প্রভাব
প্রথম প্রভাব পড়বে সরাসরি দুই পক্ষের ওপর। জমি এখন কারও নামে ছাড় হবে না। স্থিতাবস্থার কারণে কেউ দখল বদলাতে পারবেন না। দেওয়ানি আপিল ২০২১ সাল থেকে এবং হাইকোর্টের রিভিশন ২০২৪ সাল থেকে চলছে। তাই চূড়ান্ত ফল আসতে আরও সময় লাগতে পারে। এই সময় জমি আইনি জটে বাঁধা থাকবে।
দ্বিতীয় প্রভাব প্রশাসনের ওপর। ফরিদপুরের ডিসি এখন চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায়। ফল এলে তিনি বিজয়ী পক্ষের নামে জমি ছাড়বেন। এতে ভুল ব্যক্তির নামে জমি ছাড়ার ঝুঁকি কমে। রেকর্ড বারবার বদলানোর জটিলতাও কমে। জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণ বা ইজারার ক্ষমতা নিয়ে রায়ে নতুন কিছু বলা হয়েছে কি না, পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখে নিশ্চিত বলা যায় না।
তৃতীয় প্রভাব আইনি নজির নিয়ে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের ঘোষিত আইন অধস্তন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে এই রায় নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মূল নীতি হলো, জটিল স্বত্বের প্রশ্ন রিটে নয়, দেওয়ানি আদালতে ঠিক হবে। প্রতিটি মামলার তথ্য আলাদা, তাই অন্য মামলায় এই রায় কতটা প্রযোজ্য হবে, তা আদালতই বলবেন। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কোনো তথ্য এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পাওয়া যায়নি।
জমি নিয়ে ঝুঁকি এড়াতে করণীয়
এই রায় থেকে সাধারণ মানুষ কয়েকটি শিক্ষা পেতে পারেন। জমি কেনার আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও উপজেলা ভূমি অফিসে খোঁজ নিন, জমি ক তফসিলের তালিকায় আছে কি না। তালিকাভুক্ত জমি অবমুক্তির আগে বিক্রি করলে ধারা ৮ অনুযায়ী সেই বিক্রি বাতিল ও ফলহীন। এতে ক্রেতার টাকাও আটকে যেতে পারে।
খতিয়ান, দাগ নম্বর, নামজারি ও খাজনার রশিদ মিলিয়ে দেখুন। জমি নিয়ে দেওয়ানি মামলা বা ট্রাইব্যুনালে মামলা আছে কি না, তাও জানুন। মামলা চলাকালে জমি কিনলে ঝুঁকি থাকে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ধারা ৫২ অনুযায়ী মামলা চলাকালে হস্তান্তর করে অন্য পক্ষের ডিক্রির অধিকার ক্ষুণ্ন করা যায় না। তাই দলিল হাতে থাকলেও পরে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বায়না করলে তা লিখিত ও রেজিস্ট্রি করুন। বিক্রেতা বায়না নিয়েও অন্যকে বিক্রি করলে দেরি না করে আইনজীবীর পরামর্শ নিন। চুক্তি কার্যকরের মামলার সময়সীমা আছে। আপনি যদি মূল মালিকের উত্তরাধিকারী হন, তাহলে দেখুন জমি ক তফসিলের তালিকায় আছে কি না। থাকলে ধারা ১০ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে সময়মতো আবেদন করতে হয়। সময়ে আবেদন না করলে ধারা ২৬ অনুযায়ী জমি সরকারি সম্পত্তি গণ্য হতে পারে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই মামলায় সময় অনেক লেগেছে। ট্রাইব্যুনালের রায় এসেছে ২০১৮ সালে, আপীল ট্রাইব্যুনালের রায় ২০২১ সালে এবং হাইকোর্টের রায় ২০২৬ সালে। আইনে ট্রাইব্যুনালের জন্য সময়সীমা বাঁধা আছে (ধারা ১০ উপধারা ৭)। তাই নতুন আইনের দাবির আগে বিদ্যমান সময়সীমা মানা এবং দেওয়ানি আদালত ও ট্রাইব্যুনালের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। দেওয়ানি আপিল ও রিভিশন দ্রুত শুনানি হলে বিজয়ী পক্ষ আগে জমি ফেরত পাবেন।

