১৯৯৩ থেকে ১৯৯৪ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৭৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছরের আগে। ২০২২ সালে এই হার নেমে এসেছে ৫১ শতাংশে। প্রায় তিন দশকে কমেছে মাত্র ২২ শতাংশ পয়েন্ট। বছরে গড়ে কমেছে ০.৭ পয়েন্ট। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপের তুলনায় এই গতি অনেক ধীর।
বাল্যবিবাহের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা ও সম্পদকে বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী নির্দেশক ধরা হয়। বাংলাদেশে এই দুটি উপাদান তুলনামূলক কম কাজ করছে। মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়া ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ২৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে। সবচেয়ে ধনী পরিবারেও প্রায় প্রতি তিনজনে একজনের, অর্থাৎ ৩১.৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। শহর ও গ্রামের ব্যবধানও সামান্য। শহরে এই হার ৪২.৫ শতাংশ, গ্রামে ৪৯.৪ শতাংশ।
জায়গার ওপর নির্ভর করে কখন বিয়ে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের ক্ষুদ্র এলাকা প্রাক্কলন বলছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার ৫৪১টি উপজেলায় ৩৮.৩ থেকে ৬৫.৭ শতাংশের মধ্যে। উপজেলাভেদে এই ব্যবধান অনেক বড়।
খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে হার সবচেয়ে বেশি। খুলনার সব ৬৪টি উপজেলায় হার ৬০ শতাংশের বেশি (৬০.১ থেকে ৬৪.০ শতাংশ)। রাজশাহীর ৭০টি উপজেলার মধ্যে মতিহার বাদে বাকি ৬৯টিতেও একই চিত্র। দেশের সর্বোচ্চ হার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে, ৬৫.৭ শতাংশ। বগুড়া, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জেও উচ্চ হারের এলাকা আছে।
বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর ও ঢাকা বিভাগের বেশির ভাগ এলাকায় হার ৪৮ থেকে ৫৩ শতাংশের মধ্যে। ঢাকা শহরের ভেতরেও বড় ফারাক আছে। শাহবাগে হার সবচেয়ে কম, ৩৯ শতাংশ। মিরপুরে সবচেয়ে বেশি, ৬০ শতাংশ।
এর বিপরীত চিত্র সিলেটে। বিভাগটির প্রতিটি উপজেলায় হার ৪৩ শতাংশের নিচে (৩৮.৩ থেকে ৪২.৮ শতাংশ)। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে কম হার সুনামগঞ্জে। সেখানকার জগন্নাথপুর উপজেলায় দেশের সর্বনিম্ন হার, ৩৮.৩ শতাংশ।
কম বয়সে বিয়ে, পরে আফসোস
বিডিএইচএস ২০২২ অনুযায়ী, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নারীরা দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে কম বয়সে বিয়ে করেন। এই তিন বিভাগে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের প্রথম বিয়ের গড় বয়স (মধ্যমা) ১৬ বছর, যা দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। অর্থাৎ সেখানকার অর্ধেক নারীর বিয়ে হয়েছে ১৬ বছর বা তার আগে।
এই তিন বিভাগেই এমন বিবাহিত নারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যাঁরা বলেন তাঁরা আরও পরে বিয়ে করতে চাইতেন। রাজশাহীতে এই হার ৪৭ শতাংশ, খুলনায় ৪২ শতাংশ এবং রংপুরে ৩৭.৮ শতাংশ।
সিলেট বিভাগ এর ঠিক উল্টো অবস্থানে। এটিই দেশের একমাত্র বিভাগ, যেখানে প্রথম বিয়ের গড় বয়স ১৮ বছরের বেশি, ১৮.৮ বছর। সিলেটে মাত্র ১৬.৬ শতাংশ নারী বলেছেন, তাঁরা পরে বিয়ে করতে চাইতেন। রাজশাহী ও খুলনার নারীদের মধ্যে এমন মনোভাব সিলেটের তিন গুণ।
গবেষণায় বাল্যবিবাহের সঙ্গে কম শিক্ষা, স্বামীর পরিবারে কম মর্যাদা, প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে কম স্বাধীনতা এবং মাতৃমৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশসহ ৩৪টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু বয়সে বিয়ে হওয়া নারীরা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে হওয়া নারীদের চেয়ে স্বামীর হাতে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
সিলেটের ধাঁধা
প্রচলিত সূচক অনুযায়ী সিলেটে বাল্যবিবাহের হার বেশি হওয়ার কথা। বিডিএইচএস ২০২২ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে মাধ্যমিক বা তার বেশি শিক্ষিতের হার সেখানে দেশে সবচেয়ে কম। শিক্ষাহীন নারীর হার সবচেয়ে বেশি। নারীর কর্মসংস্থানও সবচেয়ে কম, ১৮.৮ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় ৩২ শতাংশ।
সম্পদ দিয়েও এই চিত্রের ব্যাখ্যা মেলে না। নোয়াখালী ও ঢাকায় দারিদ্র্যের হার দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম, যথাক্রমে ৬.১ ও ৬.৮ শতাংশ। তবু এই দুই জেলার উপজেলাগুলোয় বাল্যবিবাহের গড় হার প্রায় ৫২ শতাংশ। দারিদ্র্য সবচেয়ে কম এমন ১০টি জেলার মধ্যে মেহেরপুর, খুলনা, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ায় প্রতি ১০ জন নারীর ছয়জনের বেশির বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে।
আইরিস গ্রুপের ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যসূচকে সিলেট পিছিয়ে থাকলেও সেখানে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে কম। আইরিস গ্রুপ নারীদের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।
কারণ খুঁজতে দ্য ডেইলি স্টার জগন্নাথপুরে যায়। প্রতিনিধিরা সুনামগঞ্জে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, রাজনীতিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন।
জগন্নাথপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসলাম উদ্দিন দেরিতে বিয়ের কারণ হিসেবে আংশিকভাবে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে চাওয়া পুরুষদের কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, “বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেটের ছেলেরা বেশি বয়সে বিয়ে করে। এটি প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। বেশির ভাগ তরুণ বিদেশে যেতে চায়। বিদেশে গিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সময় লাগে।”
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সিলেটের ৩৭.৭৭ শতাংশ বাসিন্দা অবিবাহিত। জাতীয় গড় ২৮.৬৫ শতাংশ। জগন্নাথপুরে অবিবাহিত পুরুষ ৪৯.৯৬ শতাংশ এবং নারী ৩৬.২৮ শতাংশ। জেলা প্রতিবেদন অনুযায়ী জগন্নাথপুরের প্রতি চারটি পরিবারের একটি প্রবাসী আয় পায়। স্থানীয়দের মতে, প্রবাসীদের বেশির ভাগ যুক্তরাজ্যে থাকেন।
পাশের শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শীতাংশু শেখর ধর ইউরোপের প্রভাবের কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, “এখানকার মানুষ যুক্তরাজ্য বা ইউরোপে থাকা মানুষদের অনুসরণ করে।” তবে সুনামগঞ্জের যেসব উপজেলায় যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের প্রবাসী তুলনামূলক কম, সেখানেও বাল্যবিবাহের হার দেশের প্রায় সব এলাকার চেয়ে কম।
সরকারি জুবিলী স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ কে এম আজাদ মিয়া মনে করেন, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণও থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি নিজের মায়ের কথা বলেন, যিনি ১৯৬৫ সালে ২৪ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন।
সর্বোচ্চ হার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বাইরে নয়াগোলা গ্রামে ছেলের সঙ্গে চায়ের দোকান চালান আশরাফুল আলম। ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে তিনি “দায়মুক্ত” হয়েছেন বলে জানান। এক মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু যৌতুকবিহীন একটি প্রস্তাব এলে তিনি তা গ্রহণ করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, দেরি করলে যৌতুক দাবি আসতে পারে এবং মেয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, “এটা শরিয়াহ্ অনুযায়ীও ঠিক।” তাঁর যুক্তি, নারীর জন্য ১৮ ও পুরুষের জন্য ২১ বছরের আইনি বিয়ের বয়স মানসিক ও শারীরিক পরিপক্বতাকে উপেক্ষা করে।
বিবিএসের ২০২৪ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৬৫.৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে। এটি দেশের সর্বোচ্চ উপজেলা পর্যায়ের হার। অথচ আইন প্রয়োগের পরিসংখ্যানে এই বিশাল চিত্রের প্রতিফলন নেই। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পুরো জেলায় বন্ধ করা হয়েছে মাত্র ১৮টি বাল্যবিবাহ। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালে বন্ধ হয়েছে আরও ৪১টি।
সরকারি কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, রাজনীতিক, শিক্ষার্থী ও বাসিন্দারা কয়েকটি কারণের কথা বলেছেন। এর মধ্যে আছে নারীর সীমিত কর্মসংস্থান, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, দারিদ্র্য, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক মনোযোগের অভাব।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাহিদা আক্তার কর্মসংস্থানের অভাবকে প্রধান কারণ বলে মনে করেন। তাঁর কথা, “নারীরা কাজের জন্য জেলার বাইরে খুব একটা যান না, আর এখানে তাঁদের জন্য কিছুই নেই।” ২০২২ সালের আদমশুমারির জেলা প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫৮.৬৭ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের কোনোটিতেই নেই। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের প্রায় অর্ধেক পড়াশোনাও করে না, কাজও করে না।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. সুলতানা পাপিয়া বলেন, তিনি যেখানে থেকেছেন বা কাজ করেছেন, অন্য কোথাও এত ব্যাপক বাল্যবিবাহ দেখেননি। উত্তরের এই জেলার জনসংখ্যা ১৮ লাখের বেশি। তিনি বলেন, “১২ থেকে ১৩ বছর বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি শিশু ধরেই নেয় যে কম বয়সে বিয়ে স্বাভাবিক। তাদের কাছে বিয়ে যেন পুতুল খেলার মতো।”
দারিদ্র্য ও “ধর্মীয় গোঁড়ামিকে” দায়ী করে তিনি জানান, জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা দিতে গেলে স্বাস্থ্যকর্মীদের কিছু মাদ্রাসায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য, “আমরা ধর্মীয় ব্যক্তিদের পাঠিয়েছি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও কাছে গিয়েছি। কিন্তু এসব আলেম অনুমতি দেননি। এই জেলায় এ ধরনের কুসংস্কার বিশেষভাবে প্রবল।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদীন ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে “চালিকাশক্তি” বলে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু আলেম মেয়েরা যে যৌন সহিংসতার শিকার হয়, সেজন্যও মেয়েদেরই দায়ী করেন।
এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আতিকুল ইসলাম মেয়েদের ব্যাপক যৌন হয়রানির কথা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, “মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেন।”
বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, বিবাহ নিবন্ধক বা কাজিরা বাল্যবিবাহে সহায়তা করেন। জেলা শিক্ষা অফিসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাল্যবিবাহ পড়াতে তাঁরা সাধারণ ফির তিন গুণেরও বেশি নেন।”
এসব বক্তব্য একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ ও দুর্বল আইন প্রয়োগ বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রাখছে। দেশ অন্যান্য ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও এই চিত্র বদলায়নি।
আইনি দৃষ্টিকোণ: আইন আছে, প্রয়োগে ঘাটতি
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিয়ন্ত্রণের মূল আইন বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ (২০১৭ সালের ৬ নম্বর আইন)। আইনের ২ ধারা অনুযায়ী, ২১ বছর পূর্ণ করেননি এমন পুরুষ এবং ১৮ বছর পূর্ণ করেননি এমন নারী অপ্রাপ্তবয়স্ক। যে বিয়ের এক পক্ষ বা দুই পক্ষই অপ্রাপ্তবয়স্ক, সেটিই বাল্যবিবাহ।
কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা দুটিই হতে পারে (৭ ধারার ১ উপধারা)। অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ বিয়ে করলে অনধিক এক মাসের আটকাদেশ বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। তবে তাঁর বিচারে শিশু আইন, ২০১৩ প্রযোজ্য হবে। আর পিতা-মাতা বা অভিভাবকের বিরুদ্ধে ৮ ধারায় মামলা হলে ওই অপ্রাপ্তবয়স্ককে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
পিতা-মাতা, অভিভাবক বা অন্য কেউ যদি বিয়ের ব্যবস্থা করেন, অনুমতি দেন, নির্দেশ দেন, কিংবা নিজের অবহেলায় বিয়ে ঠেকাতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনিও অপরাধী। ৮ ধারায় তাঁর শাস্তি ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড। যিনি বিয়ে পড়ান বা পরিচালনা করেন, তাঁর জন্য ৯ ধারায় একই শাস্তি রয়েছে।
কাজিদের বিষয়ে ১১ ধারা আরও কঠোর। কোনো বিবাহ নিবন্ধক বাল্যবিবাহ নিবন্ধন করলে তিনি ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে তাঁর লাইসেন্স বা নিয়োগ বাতিল হবে।
বাল্যবিবাহ ঠেকানোর দায়িত্ব আইন সরাসরি সরকারি কর্মকর্তাদের ওপরও দিয়েছে। ৪ ধারা অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, শিক্ষা কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি বাল্যবিবাহের খবর পেলে বিয়ে বন্ধ করবেন, অথবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। ৩ ধারায় জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি গঠনের ক্ষমতাও সরকারকে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো এলাকায় এই কর্মকর্তা ও কমিটির ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আদালতও বিয়ের আগে হস্তক্ষেপ করতে পারে। ৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো বাল্যবিবাহের আয়োজন চলছে বা তা আসন্ন বলে আদালত নিশ্চিত হলে বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন। নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। আবার মিথ্যা অভিযোগ করলে ৬ ধারায় ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান আছে।
মামলার পদ্ধতিও আইনে নির্দিষ্ট করা আছে। ১৪ ধারা অনুযায়ী, এই আইনের অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য। অর্থাৎ পুলিশ বিনা পরোয়ানায় ব্যবস্থা নিতে পারে, তবে আসামি জামিন পাওয়ার অধিকার রাখেন, আর দুই পক্ষ আপসে মামলা মিটিয়ে ফেলতে পারে না। বিচার হয় সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে (১৫ ধারা)। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে মোবাইল কোর্টও দণ্ড দিতে পারে (১৭ ধারা)। এখানে আরেকটি বিষয় জরুরি। অপরাধ ঘটার দুই বছরের মধ্যে অভিযোগ না করলে আদালত তা আমলে নেবেন না (১৮ ধারা)। ফলে সময়মতো অভিযোগ না হলে অনেক বিয়ে আইনের নাগালের বাইরে চলে যায়।
বয়স নিয়ে বিতর্ক এড়াতে ১২ ধারায় বয়সের প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি দলিল গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। এগুলো হলো জন্ম নিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, মাধ্যমিক, জুনিয়র বা প্রাইমারি স্কুলের সনদ বা সমমানের সনদ এবং পাসপোর্ট। ১৩ ধারা অনুযায়ী আদায় করা অর্থদণ্ডের টাকা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে, অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক পক্ষকে, ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হয়। তবে অপ্রাপ্তবয়স্কের ওপর আরোপিত জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
বিশেষ বিধান নিয়ে প্রশ্ন
আইনের ১৯ ধারা সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ। এতে বলা হয়েছে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা অভিভাবকের সম্মতিক্রমে বিয়ে হলে তা এই আইনে অপরাধ গণ্য হবে না। আইনে এই ছাড়ের জন্য ন্যূনতম বয়স নির্দিষ্ট করা নেই। আইন পাসের সময় থেকেই নারী অধিকার কর্মীরা এই বিধানের অপব্যবহারের আশঙ্কা করে আসছেন।
২০১৮ সালে চূড়ান্ত হওয়া বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালা অনুযায়ী, ধর্ষণ বা এ-সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন থাকলে এই বিশেষ বিধান প্রযোজ্য হবে না বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একই খবরে বলা হয়েছে, বিশেষ অবস্থায় বিয়ের সিদ্ধান্ত দেবে উপজেলা যাচাই কমিটি। বিধিমালার গেজেট পাঠ আমি এখনো মিলিয়ে দেখতে পারিনি।
আরেকটি আইনি প্রশ্ন বিয়ের বৈধতা নিয়ে। ২০১৭ সালের আইনে বাল্যবিবাহকে অপরাধ বলা হয়েছে এবং শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু আইনের পাঠে এমন বিয়ে আপনাআপনি বাতিল হবে, এমন কোনো ধারা দেখা যায়নি। তাই শাস্তির বিধান থাকলেও বিয়ের পরে সংশ্লিষ্ট কিশোরীর আইনি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
আইন ও বাস্তবতার ফারাক
প্রতিবেদনের তথ্য ও আইনের বিধান পাশাপাশি রাখলে একটি ফারাক চোখে পড়ে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে বাল্যবিবাহের হার দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পুরো জেলায় বন্ধ হয়েছে মাত্র ১৮টি বিয়ে। প্রতিবেদনে বলা নেই, এর মধ্যে কতটি ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে বা কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আইনে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার দায়িত্ব একাধিক কর্মকর্তাকে দেওয়া আছে। কিন্তু ঘটনা ঘটার পর তথ্য পেয়েও প্রশাসন কতটা ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এই তথ্যে মেলে না।
সব মিলিয়ে বোঝা যায়, শুধু আইন থাকাই যথেষ্ট নয়। আইনে অভিভাবক, কাজি, কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রতিনিধি সবার দায় ঠিক করা আছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বিধান মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হচ্ছে। সিলেটের কম হার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা ও রাজশাহীর উচ্চ হার দেখিয়ে দেয়, একই আইন দেশের সব জায়গায় সমানভাবে কাজ করছে না।
উপাত্ত সূত্রঃ ডেইলি স্টার

