আপনি কোন ধর্ম মানেন, তা দিয়ে রাষ্ট্র আপনাকে ছোট বা বড় ভাববে না। একাত্তরের স্বপ্ন ছিল এমনই। ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগে স্পিকারের আসনের ওপরের দেয়ালে কালিমা তায়্যিবা আরবি ক্যালিগ্রাফিতে লেখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে এটি স্থাপন করা হয়েছে। অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে।
এই খবরের পর অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে। সংবিধান কি বদলে যাচ্ছে? আন্তর্জাতিক আইন কি ভাঙা হচ্ছে? উত্তর খুঁজতে আমাদের পেছনে তাকাতে হবে। তাই এই লেখা ইতিহাস থেকে শুরু করে সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন হয়ে সামনের পথে শেষ হবে। প্রতিটি অংশ আগের অংশের সঙ্গে জোড়া।
পাকিস্তান আমল: ধর্মের নামে রাষ্ট্র, বাঙালির প্রতিবাদ
পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল ধর্মের পরিচয়ে। ১৯৪৯ সালে তাদের গণপরিষদ উদ্দেশ্য প্রস্তাব পাস করে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে দেশের নাম হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। কিন্তু বাঙালি ধর্মকে বাদ দেয়নি। বাঙালি চেয়েছিল ধর্ম আর রাষ্ট্র ক্ষমতা আলাদা থাকুক। ভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালে মানুষ রাস্তায় নামে। আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৫ সালে নাম থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দেয়। এটি ছিল সবার জন্য খোলা রাজনীতির দিকে এক ধাপ।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে তিনটি কথা ছিল। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। সেখানে কোনো ধর্মের নাম ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান একসঙ্গে লড়েছেন, একসঙ্গে প্রাণ দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতাই পরে সংবিধানের ভাষা তৈরি করেছে।
১৯৭২ সালের সংবিধান: ধর্মনিরপেক্ষতার প্রথম জায়গা
গণপরিষদ ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধান গ্রহণ করে। এটি কার্যকর হয় ১৬ ডিসেম্বর। রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি ছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার মানে বলা ছিল। সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা বন্ধ হবে। রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেবে না। রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার চলবে না। ধর্মের কারণে কারও ওপর বৈষম্য বা নির্যাতন হবে না।
একটি কথা এখানে পরিষ্কার করা ভালো। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীন রাষ্ট্র নয়। এর মানে রাষ্ট্র কোনো একটি ধর্মের পক্ষ নেবে না। প্রত্যেক মানুষ নিজের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবেন। এই ভাবনাই ছিল ১২ অনুচ্ছেদের মূল কথা।
১৯৭৭ সালে প্রথম বদল
পঁচাত্তরের পর দেশে সামরিক শাসন আসে। ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে জারি হওয়া ঘোষণাপত্র আদেশে সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম যুক্ত হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় আসে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস“। এক গবেষণা নিবন্ধ জানায়, ১৯৭৯ সালের পঞ্চম সংশোধনী ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে বিসমিল্লাহ যুক্ত করেছে।
অনেকে বলেন এই বদল ১৯৭৫ সালে বিএনপি সরকার করেছে। ইতিহাস তা বলে না। বিএনপি গঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। ১৯৭৭ সালের আদেশ এসেছিল দল গঠনের আগে। দলটি পরে এই পথের উত্তরাধিকার বহন করেছে, এটুকু বলা যায়। তবে তথ্য ঠিক রাখা সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত।
১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রধর্ম
তারপর এল এরশাদের আমল। ১৯৮৮ সালের অষ্টম সংশোধনীতে ২ক অনুচ্ছেদ যুক্ত করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। সেই অনুচ্ছেদে অন্য ধর্মের মানুষের জন্যও একটি কথা ছিল। তাঁরা শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে নিজ ধর্ম পালন করতে পারবেন। সংবিধানে সঠিক শব্দ কী, তা মূল পাঠ থেকে মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
এই সংশোধনীর সময়ে অনেক বিশিষ্ট নাগরিক এর বিরোধিতা করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুফিয়া কামাল, সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনসহ ১৫ জন। তাঁরা হাইকোর্টে রিট করেন। সেই মামলা আটকে ছিল প্রায় ২৮ বছর। এই দীর্ঘ অপেক্ষাই দেখায়, প্রশ্নটি কত কঠিন।
আদালত ও সংসদের ফিরে আসা
১৯৮৯ সালে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি দেয়। সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বদলাতে পারে না। এই মামলায় অষ্টম সংশোধনীর হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণের অংশ বাতিল হয়। রাষ্ট্রধর্মের অংশ নিয়ে সেই রায়ের ব্যাখ্যা আছে, তবে তা মূল প্রশ্ন নিষ্পত্তি করেনি। এই নীতি পরে অনেক মামলায় কাজে লেগেছে।
২০০৫ সালে হাইকোর্ট পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে। আপিল বিভাগ ২০১০ সালে সেই রায় বহাল রাখে। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে আসে, কিন্তু রাষ্ট্রধর্মের ২ক অনুচ্ছেদ থেকে যায়। ফলে আজকের সংবিধান দুই ভাবনা একসঙ্গে বহন করছে। এই অবস্থার কারণ সরাসরি এই ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
আজকের সংবিধান কী বলছে
বর্তমান সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম, আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও মূলনীতি। ২৮ অনুচ্ছেদ ধর্মের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে। ৪১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার দিয়েছে। এই অনুচ্ছেদগুলো একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, রাষ্ট্রধর্ম থাকলেও অন্য ধর্মের মানুষের অধিকার কমানোর সুযোগ সংবিধান দেয় না।
২০১৬ সালের ২৮ মার্চ হাইকোর্ট ২ক অনুচ্ছেদ নিয়ে সেই পুরোনো রিট খারিজ করে। আদালত বলে, আবেদনকারীদের মামলা করার অধিকার নেই। অর্থাৎ অনুচ্ছেদটি বৈধ কি না, তা আদালত সরাসরি ঠিক করেনি বলে সংবাদমাধ্যমে ব্যাখ্যা এসেছে। পূর্ণ রায়ে বিচারপতি নাইমা হায়দারের অভিমত নিয়ে ডেইলি স্টার জানিয়েছে, রাষ্ট্রধর্ম সংবিধানের মৌলিক কাঠামো নষ্ট করে না। এই অংশ পূর্ণ রায় পড়ে নিশ্চিত করা দরকার।
সংসদে কালিমা: কী ঘটল, কী ঘটেনি
এবার আজকের ঘটনায় ফিরি। দেয়ালে কালিমা লেখা সংবিধান সংশোধন নয়। কোনো আইন পাস হয়নি। কোনো অনুচ্ছেদও বদলায়নি। এটি সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং বলা ঠিক হবে না যে প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের মূলনীতি বদলে দিয়েছেন। এই দাবি প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না।
তবে প্রতীকের একটি অর্থ আছে। একটি মন্তব্য লেখায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সংসদ কার্যালয়ে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” লেখা একটি সাইনবোর্ড আছে। এটি একজন লেখকের বিশ্লেষণ, প্রমাণিত তথ্য নয়। তাই এটিকে মতামত হিসেবে দেখাই ভালো। সরকারের পক্ষে বলা হতে পারে, দেশের বেশির ভাগ মানুষ মুসলমান, তাই এই প্রতীক স্বাভাবিক। এই যুক্তিও শোনা দরকার।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে
বাংলাদেশ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) পক্ষ। এই চুক্তির ১৮ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতা দেয়। ২৬ অনুচ্ছেদ আইনের চোখে সবাইকে সমান রাখে। ২৭ অনুচ্ছেদ সংখ্যালঘুদের নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা করে। সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৮ অনুচ্ছেদেও একই কথা আছে।
এখানে সততার সঙ্গে একটি কথা বলতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন কোনো দেশকে রাষ্ট্রধর্ম রাখতে নিষেধ করে না। যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্কসহ কয়েকটি দেশে রাষ্ট্রীয় ধর্ম বা সরকারি চার্চ আছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি ১৮ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় (জেনারেল কমেন্ট ২২) বলেছে, রাষ্ট্রধর্ম থাকলেই অন্যদের অধিকার কমানো যাবে না। কোনো বৈষম্যও চলবে না। তাই শুধু কালিমা বা রাষ্ট্রধর্মের কারণে আইন ভাঙা হয়েছে, এমন দাবি টিকবে না।
আইনের ঝুঁকি আসলে কোথায়
ঝুঁকি আসে বাস্তব আচরণে। রাষ্ট্রের নীতি বা প্রতীক যদি চাকরি, বিচার, নিরাপত্তা বা নাগরিক সম্মানে কোনো ধর্মের মানুষকে পিছিয়ে দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে। তখন সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ ও আইসিসিপিআরের ২৬ অনুচ্ছেদ কাজে আসবে। সংখ্যালঘু ও ধর্মে অবিশ্বাসী মানুষ যদি নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবেন, সেটা রাষ্ট্রের জন্য সতর্কসংকেত।
সংবিধানের ৭ খ অনুচ্ছেদ আরেকটি দিক খুলে দেয়। পঞ্চদশ সংশোধনীতে যুক্ত এই অনুচ্ছেদে প্রস্তাবনা এবং প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের বিধান সংশোধন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এই তিন ভাগে ২ক, ১২ ও মৌলিক অধিকার আছে। জুলাই সনদ ও চলমান সংস্কারের পর এই অনুচ্ছেদের বর্তমান অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
ফিরে এসে কী বলেছিলেন
প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে কাটিয়ে তারেক রহমান দেশে ফেরেন। তখন সংবাদ প্রতিবেদন বলছে, তিনি আহ্বান জানান, বাংলাদেশ সবার, ধর্ম বা দল যা–ই হোক। মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টানের ঐক্যের কথাও তিনি বলেছিলেন। কথাটা ভালো ছিল। সংখ্যালঘুদের মনে আশা জাগিয়েছিল। এই কথাকে সামনে রেখেই পরের সিদ্ধান্তগুলো মাপতে হবে। কিন্ত এরপর সংসদ থেকে শুরু করে প্রাইম মিনিস্টারের রুমে নির্দিষ্ট ধর্মের গুরুত্ব উনার পূর্ববর্তী কথার সাথে মিলে না। ১৭ বছর একটা সেকুলার কান্ট্রিতে থেকে এসে, নিজের দেশের সংবিধানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে প্রাধান্য দেয়া বেমানান।
সামনে পথ কী
প্রথম কাজ হলো সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা। ধর্মের নামে কেউ হামলা বা হয়রানির শিকার হলে দ্রুত বিচার চাই। সরকারি চাকরি ও সেবায় বৈষম্য আছে কি না, তা নিয়মিত দেখা দরকার। একটি স্পষ্ট বৈষম্যবিরোধী আইন এ ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। সংসদে এই বিষয়ে খোলা আলোচনা হোক। সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষই নিজেদের যুক্তি জনগণের সামনে রাখুক।
কালিমা বহু কোটি মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা বহু কোটি মানুষের সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি। দুটি কথা একসঙ্গে রাখা কীভাবে সম্ভব, তা ভেবে দেখার বিষয়। কিন্ত রাষ্ট্র প্রতিদিনের কাজে সবাইকে সমান চোখে দেখে তাহলে হয়তো এই প্রশ্ন আর থাকবে না।
প্রশ্ন তাই কালিমার নয়। প্রশ্ন হলো, সংবিধানের ওয়াদা কি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী ও ধর্মহীন মানুষের কাছেও সমান সত্য? কিন্ত ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সাথে বিরুদ্ধে এই পরিবর্তন কতএর উত্তর শুধু দেয়ালে নয়, আদালতের রায়ে, থানার ব্যবহারে ও সংসদের আইনে লেখা হবে।

