ঝিনাইদহের মিশন আচার্য সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক দুই ধাপে উত্তীর্ণ হয়েও স্থায়ী ঠিকানার জটিলতায় নিয়োগ পাচ্ছিলেন না। ৬ অক্টোবর তিনি কাজে যোগ দিয়েছেন। একজনের চাকরি হয়েছে, কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। যাঁর নিজের কোনো জমি বা বসতভিটা নেই, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা কোথায়? আইনের বইয়ে এর সরল উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই প্রতিবেদনে আমরা দেখব, সংবিধান, আইন, বিধি এবং আদালতের রায় এ বিষয়ে কী বলে।
মিশন আচার্য একা নন। নদীভাঙনে সব হারানো পরিবার, বস্তির বাসিন্দা, ভাসমান বেদে, চা বাগানের শ্রমিক কিংবা এতিমখানায় বড় হওয়া তরুণ, সবার সামনে একই প্রশ্ন আসতে পারে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার চর, পাহাড় ও শহরের বস্তি এলাকায় অনেক কম। অর্থাৎ যাঁদের ঠিকানার কাগজ সবচেয়ে দুর্বল, নিবন্ধনের জালও তাঁদের কাছ থেকেই সবচেয়ে দূরে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে ঠিকানা না থাকাই একজন মানুষের সব সুযোগ আটকে দিতে পারে।
স্থায়ী ঠিকানার সংজ্ঞা কোথায়
আমরা এমন কোনো একক আইন খুঁজে পাইনি, যা সব ক্ষেত্রের জন্য স্থায়ী ঠিকানার সংজ্ঞা দেয়। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন এবং বিভিন্ন নিয়োগবিধিতে ঠিকানার কথা আছে। কিন্তু একেক জায়গায় তার মানে একেক রকম। বাস্তবে অনেক দপ্তর স্থায়ী ঠিকানা বলতে বাপদাদার ভিটাকেই ধরে নেয়। সেই ভিটা না থাকলে প্রার্থী যাচাইয়ে আটকে যান।
নাগরিকত্ব আর ঠিকানা এক জিনিস নয়
নাগরিকত্ব ঠিক হয় বাংলাদেশ নাগরিকত্ব (সাময়িক বিধান) আদেশ, ১৯৭২ এবং নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫১ অনুযায়ী। এখানে জন্ম, বংশ এবং ১৯৭১ সালের আগের স্থায়ী বসবাসের কথা আছে। জমির মালিকানা বা নিজস্ব বাড়ি থাকার কোনো শর্ত আমরা সেখানে দেখিনি। তাই কেউ জন্মসূত্রে নাগরিক হলে ঠিকানার কাগজ না থাকলেও তাঁর নাগরিকত্ব চলে যায় না। হাইকোর্টও এই পার্থক্য মেনেছে। সাদাকাত খান মামলার মো. সাদাকাত খান (ফাক্কু) এবং অন্যান্য বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার’ (Writ Petition No. 10129 of 2007) রায় ক্যাম্পে থাকা উর্দুভাষী মানুষদের নাগরিকত্বের প্রশ্নে ১৯৭২ সালের আদেশের ২ অনুচ্ছেদের শর্ত মানলে তাঁদের নাগরিক হিসেবে গণ্য করেছে। ক্যাম্পে থাকা মানে সেখানে সম্পত্তির মালিক হওয়া নয়। তবু আদালত তাঁদের নাগরিকত্ব স্বীকার করেছে।
সংবিধান কী বলে
সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের দেশের যেকোনো জায়গায় থাকার ও বসবাস করার অধিকার আছে। এর মানে ঠিকানা মানুষের বর্তমান বসবাসের সঙ্গে জড়িত, পূর্বপুরুষের জমির সঙ্গে নয়। ১৫(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানসহ জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদে সবাই আইনের চোখে সমান এবং ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সবার সমান সুযোগের কথা আছে। তাই যে শর্ত একজন গরিব নাগরিককে চাকরির দরজা থেকে ফিরিয়ে দেয়, তা এই নীতির সঙ্গে মিলছে কি না, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
আদালত এ পর্যন্ত কী বলেছে
বাসস্থান ও জীবিকা নিয়ে হাইকোর্টের একটি পরিচিত রায় আছে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র বনাম বাংলাদেশ, ১৯ বিএলডি (এইচসিডি) ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৪৮৮। আদালত বলেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো সরাসরি আদালতে বলবৎযোগ্য নয়, কিন্তু জীবনের অধিকারের মধ্যে জীবিকা হারানো থেকে সুরক্ষাও পড়ে। পুনর্বাসনের সুপারিশ করা হলেও তা অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি হাইকোর্ট রায়েও উচ্ছেদ আইনসম্মত হতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মানতে হবে বলে উল্লেখ আছে। তবে ঠিকানাহীন নাগরিকের চাকরির যোগ্যতা নিয়ে সরাসরি কোনো রায় আমরা খুঁজে পাইনি।
জন্মনিবন্ধন আইন কী বলে
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী নিবন্ধন সবার জন্য বাধ্যতামূলক। জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করতে হয়। আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী সরকারি জন্ম সনদ আদালত, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বয়স ও জন্মের তথ্যের আইনগত প্রমাণ। কিন্তু বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৯(ক)(আ) ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে কর পরিশোধের কাগজ বা পরিবারের সদস্যদের পরিচয়পত্রের মতো নথি চায়। বিধি ২(১)(২১) আবার তিন বছর বসবাস বা নদীভাঙনের পর নতুন জায়গায় থাকাকেও স্থায়ী ঠিকানা ধরার সুযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ বিধিমালায় বসবাসকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি দরজা আছে। সমস্যা হলো, বাস্তবে কাগজের শর্ত সেই দরজাকে অনেক সময় আটকে দেয়।
নিয়োগবিধিতে ঠিকানার শর্ত
সহকারী শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫ এর বিধি ৪(৩)(ক) এ নাগরিকত্ব, স্থায়ী বসবাস ও ডমিসাইলের শর্ত আছে। বিধি ৭(২)(ক) অনুযায়ী নিয়োগ উপজেলা এবং প্রয়োজনে থানাভিত্তিক। এলাকাভিত্তিক নিয়োগে ওই এলাকার বাসিন্দা হওয়ার শর্ত যুক্তিসংগত হতে পারে। কিন্তু বাসিন্দা হওয়া আর জমির মালিক হওয়া এক কথা নয়। যাচাইয়ে যদি মালিকানাকেই বসবাসের একমাত্র প্রমাণ ধরা হয়, তাহলে ভাড়াটিয়া ও ভিটাহীন প্রার্থীরা অন্যায্যভাবে পিছিয়ে পড়েন। এটি আমাদের আইনি বিশ্লেষণ, আদালতের সিদ্ধান্ত নয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার চুক্তি এবং শিশু অধিকার সনদের পক্ষ। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির ১২ অনুচ্ছেদে চলাচল ও বসবাসের স্বাধীনতার কথা আছে। একই চুক্তির ২৪ অনুচ্ছেদ এবং শিশু অধিকার সনদের ৭ অনুচ্ছেদে জন্মের পরপরই শিশুর নিবন্ধনের কথা আছে। অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার চুক্তির ১১ অনুচ্ছেদে পর্যাপ্ত আবাসনের অধিকার স্বীকৃত। এসব চুক্তি সরাসরি আদালতে প্রয়োগযোগ্য কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। তবে নীতি তৈরির সময় রাষ্ট্রের এসব প্রতিশ্রুতির কথা মাথায় রাখা উচিত।
অন্য দেশে কী ঘটে
ভারতের আধার ব্যবস্থায় ঠিকানার কাগজ না থাকলে পরিচয়দাতার মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ আছে বলে জানা যায়। যুক্তরাজ্যে ঘরহীন মানুষ ভোটার তালিকায় নাম তোলার সময় যেখানে বেশিরভাগ সময় থাকেন, সেই জায়গার ঘোষণা দিতে পারেন বলে আমাদের জানা আছে। আইনগতভাবে এটিকে ‘ডিক্লারেশন অব লোকাল কানেকশন’ (Declaration of Local Connection) বলা হয়। তবু এখান থেকে একটি ধারণা পাওয়া যায়। অনেক দেশ ঠিকানাকে মালিকানার প্রমাণ না ধরে, বসবাসের ঘোষণা ও স্থানীয় স্বীকৃতির বিষয় হিসেবে দেখে।
তাহলে সমাধান কী হতে পারে
প্রথমে আইনে স্থায়ী ঠিকানার একটি সাধারণ সংজ্ঞা দরকার। সেখানে মালিকানার বদলে স্বাভাবিক বা নিয়মিত বসবাসকে মূল ভিত্তি ধরা যেতে পারে। বা যুক্তরাষ্ট্রের আদলে বেশিরভাগ সময় যেইখানে থাকে, সেই জায়গাকে ঘোষনা দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ঠিকানা প্রমাণের একটি ধাপে ধাপে ব্যবস্থা করা যায়। প্রথমে পৈতৃক ঠিকানা, না থাকলে নিয়মিত বসবাসের ঠিকানা, তা–ও না থাকলে স্থানীয় সরকার সনদ বা নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্রের ঠিকানা। তৃতীয়ত, পুলিশ যাচাইয়ে মালিকানা নয়, পরিচয় ও অপরাধের রেকর্ড দেখাই মূল কাজ হওয়া উচিত। এগুলো আমাদের প্রস্তাব, বর্তমান আইনের অংশ নয়।
নিরাপত্তার দিকটিও সমান জরুরি। ভুয়া ঠিকানা দিয়ে পরিচয় লুকানোর অভিযোগ আগেও উঠেছে, তাই সহজ নিয়ম মানে দুর্বল যাচাই নয়। সেনাবাহিনী, পুলিশ বা বিসিএসের মতো সংবেদনশীল চাকরিতে আলাদা কড়াকড়ির সুযোগ রাখা যেতে পারে। মূল কথা হলো, ঠিকানা নেই বলে একজন প্রকৃত নাগরিক যেন অধিকার না হারান, আবার সহজ নিয়মের ফাঁক দিয়ে প্রতারকও যেন ঢুকতে না পারে। মিশন আচার্যের ঘটনায় সমাধান এসেছে মন্ত্রীর ফোনে। পরের বার একই সমাধান আইনের ভাষায় আসা উচিত।

