রাজধানীর কলাবাগানে ১১ বছরের এক গৃহকর্মী আদালতে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছে। গত ১২ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সে জবানবন্দি দেয়। শিশুটি আদালতকে জানায়, সামান্য কিছু হলেই তাকে মারধর করা হতো এবং খাবার দেওয়া হতো না। সে আরও অভিযোগ করেছে, গৃহকর্ত্রী তার গায়ে গরম পানি ঢেলেছেন। আদালত তাকে বাবার জিম্মায় দিয়েছে। মামলাটি ঢাকার ৭ নম্বর শিশু আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী শিশুটির বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায়। মায়ের মৃত্যুর পর আর্থিক সংকটে বাবা তাকে একজন প্রতিবেশীর মধ্যস্থতায় ফেনীতে পাঠান। সেখান থেকে তাকে ঢাকায় আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় ১১ মাস তার ওপর নির্যাতন চলেছে এবং বাবার সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। গত ১১ সেপ্টেম্বর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে বাবা মেয়ের শরীরে ক্ষতচিহ্ন দেখতে পান। তিনি থানায় মামলা করেন। পুলিশ গৃহকর্ত্রী ও তার স্বামীকে গ্রেফতার করে। রিমান্ড শেষে আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করেছে। এটি এখনো অভিযোগ ও তদন্তের পর্যায়ে আছে। কারও দোষ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। চলতি বছরের মার্চে উত্তরায় বিমান বাংলাদেশের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বাসা থেকে ১১ বছরের আরেক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ সেই কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করেছে। ২০২৪ সালে বসুন্ধরায় ১৩ বছরের কল্পনার ওপর নির্যাতনের ঘটনা সারা দেশে আলোচনা তোলে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৪০ জন শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫০টি ঘটনা আইনি প্রক্রিয়ায় গেছে।
গৃহকর্মীদের জন্য সরকারের হাতে আছে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি ২০১৫। মন্ত্রিসভা ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর খসড়াটি অনুমোদন দেয়। নীতিতে চুক্তি, কাজের সময়, সাপ্তাহিক ছুটি, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা ও মাতৃত্বকালীন সুবিধার কথা আছে। নজরদারির জন্য মনিটরিং সেল এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থার প্রস্তাবও আছে। কিন্তু নীতি আইন নয়। এটি সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্ত। না মানলে কোনো শাস্তির বিধান নেই। তাই নীতি ভাঙার অভিযোগে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না।
বাস্তবতায় নীতির প্রভাব সীমিত। বিলস ও ডিনেটের জরিপ নিয়ে ডেইলি স্টার ২০২৩ সালে জানায়, প্রায় ৯৯ শতাংশ গৃহকর্মী নীতিটির কথা জানেন না। ৮৭ শতাংশের কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মীদের ৯৬ শতাংশ কারও কাছে অভিযোগ করেননি। একই প্রতিবেদনে শ্রমিক নেতারা বলেছেন, কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল একটি বৈঠকও করেনি। জেলা ও উপজেলার সেল গঠনই হয়নি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হাইকোর্ট নীতিটিকে অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন। কারণ ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, ছুটির সংখ্যা ও আপিলের নিয়ম এতে নেই। আদেশের পূর্ণ পাঠ আমরা দেখতে পারিনি। তাই এটিকে আদালতের পর্যবেক্ষণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
শ্রম আইনের অবস্থান এবার বদলেছে, তবে অল্প। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ১ এর উপধারা ৪ এ গৃহ পরিচারকেরা এত দিন আইনের বাইরে ছিলেন। ২০২৬ সালের ৪৩ নম্বর আইন, যা ১০ এপ্রিল পাস হয়, সেই দফা বদলে দিয়েছে। এখন গৃহ পরিচারকেরা শুধু দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ অধ্যায়ের ক্ষেত্রে আইনের আওতায় আসবেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী এর ফলে ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে সীমিত সুরক্ষা যুক্ত হয়েছে। কাজের সময়, মজুরি ও ছুটির মতো মৌলিক বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনপ্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দীন আহমেদও বলেছেন, গৃহশ্রমিকদের পরিপূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া হয়নি।
শিশুশ্রমের প্রশ্নে একটি জটিলতা দেখা যাচ্ছে। শ্রম আইনের ধারা ৩৪ এর উপধারা ১ অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নিয়োগ করা যায় না। ধারা ৪৪ এ ১২ বছর বয়স থেকে শর্তসাপেক্ষে হালকা কাজের সুযোগ আছে। কিন্তু সংশোধিত আইনে গৃহ পরিচারকেরা সব অধ্যায়ের আওতায় নন। তাই এই বয়স নিয়ম গৃহকর্মের ক্ষেত্রে সরাসরি খাটে কি না, তা আইনজীবীদের যাচাই করা দরকার। এটি আমাদের বিশ্লেষণ, কোনো আদালতের সিদ্ধান্ত নয়। শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গত জুনে বলেছেন, গৃহকর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় আনা দরকার এবং ১৪ বছরের নিচে শিশুদের গৃহশ্রম বন্ধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার ইচ্ছা সরকারের আছে।
নির্যাতনের বিচারের জন্য এখন মূল ভরসা ফৌজদারি আইন। দণ্ডবিধির ধারা ৩২৬ এ আগুন বা গরম বস্তু দিয়ে গুরুতর জখম করার কথা আছে। এই ধারায় যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে বলে ১৮৬০ সালের মূল পাঠে দেখা যায়। কলাবাগানের মামলায় কোন ধারা প্রয়োগ হয়েছে, তা প্রতিবেদনে নেই। শিশু আদালতে মামলা যাওয়ায় শিশু আইন ২০১৩ এর বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তবে এসব আইন নির্যাতনের পরে কাজ করে। দৈনিক কাজের সময়, বিশ্রাম ও মজুরি কে দেখবে, সেই কাঠামো নেই। টিবিএসের প্রতিবেদনে এক আইনজীবীও বলেছেন, ফৌজদারি আইন চরম সহিংসতার পরে আসে, কিন্তু প্রতিদিনের অবস্থা কেউ কাঠামোবদ্ধভাবে দেখে না।
আদালত এ বিষয়ে আগেও নির্দেশনা দিয়েছে। ডেইলি স্টারের একটি আইন বিষয়ক লেখা অনুযায়ী বিএনডব্লিউএলএ বনাম মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ ২০১১ সালে গৃহকর্মীদের শ্রম আইনের শ্রমিক সংজ্ঞায় আনতে নির্দেশনা দেয়। এই রায়ের মামলা নম্বর ও পূর্ণ পাঠ আমরা পাইনি। ২০২২ সালে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর বেঞ্চ একটি রুল জারি করেন। তাতে জানতে চাওয়া হয়, গৃহকর্মীদের জন্য নির্দেশিকা না করার নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। রুল মানে আদালত কারণ জানতে চেয়েছে, এটি চূড়ান্ত রায় নয়। এ বছরের ১৯ এপ্রিল বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ আরেকটি রুল দেন। এতে ১৯৬১ সালের গৃহ পরিচারক নিবন্ধন অধ্যাদেশ কার্যকর না করার নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। রিটটি করেছেন আইনজীবী খাদিজাতুল কোবরা। রুলের পরবর্তী অবস্থা আমরা যাচাই করতে পারিনি।
নির্দিষ্ট নির্যাতনের মামলায় বিচারিক আদালতের দুটি রায় এই বিষয়ে দৃষ্টান্ত দেয়। ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৩ এর বিচারক জয়শ্রী সমদ্দার গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা দেন। শিশু গৃহকর্মী আদুরিকে নির্যাতন করে মৃত ভেবে ডাস্টবিনে ফেলার মামলা এটি। এ বছরের ২৮ জুন একই ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহানাজ সুলতানা দক্ষিণ বনশ্রীর ১৪ বছরের গৃহকর্মী হাওয়া আক্তারকে নির্যাতনের মামলায় মোস্তাকিন শরীফ ও জান্নাতুল নাঈমাকে সাত বছর করে কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা দেন। রায় এসেছে ঘটনার প্রায় আট বছর পর। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে কি না, আমরা জানি না। দুটি রায় শাস্তির সম্ভাবনা দেখায়, কিন্তু দেরির সমস্যাও দেখায়।
তাহলে কি নতুন আইন দরকার? বিলস ও অক্সফামের গবেষণা বলছে, ২০২৬ সালের সংশোধনীর পরও ২০১৫ সালের নীতির আলোকে আলাদা বিধিমালা না হলে সুফল মিলবে না। গবেষণায় নিয়োগপত্র, রসিদ বা ডিজিটাল মাধ্যমে মজুরি দেওয়া, নিয়োগকর্তার দায় ঠিক করা এবং সহজ নিবন্ধনের সুপারিশ এসেছে। মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ ২০২৪ সালে বলেন, গৃহকর্মী নির্যাতন নিয়ে একটি খসড়া আইন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে। এর পর আর অগ্রগতির সময়সীমা জানা যায়নি। আমাদের বিশ্লেষণে বর্তমান ফৌজদারি আইন শাস্তির জন্য কিছুটা যথেষ্ট, কিন্তু প্রতিরোধ, নিবন্ধন, পরিদর্শন ও ক্ষতিপূরণের জন্য আলাদা বিধান দরকার।
এখানে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গৃহকর্মী সনদ ১৮৯ গৃহকর্মীদের অন্য শ্রমিকদের মতো অধিকার দিতে বলে। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৩৫টি দেশ সনদটি অনুসমর্থন করেছে। বাংলাদেশ এর পক্ষে ভোট দিলেও এখনো অনুসমর্থন করেনি। ফিলিপাইন আলাদা গৃহকর্মী আইন করেছে। এতে ন্যূনতম বয়স, কাজের সময়, বিশ্রামের দিন এবং শিক্ষা ও যোগাযোগের অধিকার আছে। ব্রাজিল ২০১৩ সালে সংবিধান সংশোধন করে গৃহকর্মীদের অন্য কর্মীদের সমান মৌলিক অধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত কাজের মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল আছে। এই দুই দেশ উন্নত অর্থনীতির নয়, তবে আইনি কাঠামো শেখার মতো।
উন্নত অর্থনীতির দিকেও উদাহরণ আছে। সিঙ্গাপুরে ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিদেশি গৃহকর্মীদের কাজের অনুমতিপত্রের শর্ত হিসেবে সাপ্তাহিক বিশ্রামের দিন বা তার বদলে ক্ষতিপূরণ বাধ্যতামূলক হয়েছে। হংকংয়ে গৃহকর্মীরা প্রধান শ্রম আইনের আওতায় আছেন এবং সাপ্তাহিক ছুটি পান বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবিধানিক আদালত ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর মাহলাঙ্গু বনাম শ্রমমন্ত্রী মামলায় ([2020] ZACC 24, মামলা নম্বর CCT 306/19) রায় দেয়। আদালত বলে, কর্মক্ষেত্রে আঘাত বা মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ আইন থেকে গৃহকর্মীদের বাদ রাখা সংবিধানবিরোধী। রায়ের ফল ১৯৯৪ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। এই উদাহরণগুলো দেখায়, গৃহকর্মকে শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দিলে ক্ষতিপূরণ, বিশ্রাম ও বিচারের পথ খোলে।
এই বছর শ্রম আইনের মধ্যে গৃহকর্মীকে যুক্ত করার মাধ্যমে আইনি স্বীকৃতি দিলেও কমছে না নির্যাতন। বাংলাদেশের জন্য তিনটি পদক্ষেপ সবচেয়ে জরুরি বলে মনে হয়। প্রথমত, ২০১৫ সালের নীতিকে বাধ্যতামূলক আইন বা বিধিমালায় রূপ দিয়ে শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের বিধান যোগ করা। দ্বিতীয়ত, ১৯৬১ সালের নিবন্ধন অধ্যাদেশ কার্যকর করে নিয়োগকর্তা ও কর্মীর পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়ত, গৃহকর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকায় এনে ১৪ বছরের নিচের শিশুদের কাজ বন্ধ করা এবং স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে নিয়মিত পরিদর্শন চালানো। কলাবাগানের শিশুটি এখন বাবার কাছে ফিরেছে। কিন্তু অনেক শিশু এখনো অন্যের ঘরে নীতির কাগজ ছাড়া আর কোনো সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করছে।

