সৌদি আরবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৯ জনই বিদেশি নাগরিক। এই তালিকায় বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) পরিসংখ্যানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে ওই ছয় মাসে কতজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তা সংস্থাটির হিসাবে আলাদা করে জানা যায়নি।
সম্প্রতি মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তাঁদের মৃত্যুদণ্ড অবশ্য প্রথম ছয় মাসের ১০৮ জনের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ১৭টি দেশের নাগরিক ছিলেন। বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তানের নাগরিক রয়েছেন।
মাদক মামলায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড
প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে। এ ধরনের মামলায় ৭১ জনের সাজা কার্যকর হয়েছে। মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৬৬ শতাংশই ছিল মাদকসংক্রান্ত মামলায়।
এর মধ্যে ৪৯ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশিদের মধ্যে ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের নাগরিকের সংখ্যা বেশি ছিল।
এ ছাড়া হত্যার মামলায় ২৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় হয়েছে ৯ জনের। অন্য ধরনের মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ৩ জনের।
মোট ১০৮ জনের মধ্যে ৮৩ জনের বিরুদ্ধে এমন অপরাধের অভিযোগ ছিল, যার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। এই সংখ্যা মোট মৃত্যুদণ্ডের ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৪টি কার্যকর করা হয়েছে ‘তাজির’ ধরনের শাস্তির ভিত্তিতে। অর্থাৎ বিচারকদের বিবেচনামূলক ক্ষমতার ভিত্তিতে এসব সাজা দেওয়া হয়েছিল। এই সংখ্যা মোট মৃত্যুদণ্ডের ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
সংস্থাটি আরও বলেছে, ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৯১টির বিষয়ে সাজা কার্যকরের আগে কোনো তথ্য পাওয়া বা নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। এসব মামলা মোট সংখ্যার ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ।
মানবাধিকার সংস্থাটির মতে, এতে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মামলাতেও মৃত্যুদণ্ড
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায়ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব।
এর মধ্যে জুনে সৌদ আল ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি উল্লেখ করেছে ইএসওএইচআর। তাঁর আটকাদেশকে এর আগে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে জানিয়েছিল জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ।
এ ছাড়া ৯ এপ্রিল আলী আল সুবাইতি নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের মধ্যে ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও ছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আরও অনেকে
ইএসওএইচআর বলেছে, শৈশবে করা কথিত অপরাধের জন্য অন্তত পাঁচজন এখনো মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের আটকাদেশকে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ বেআইনি বলে উল্লেখ করেছিল।
শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জনও মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তাঁদের মধ্যে শেখ সালমান আল আওদা ও শেখ হাসান আল মালিকির নাম রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আসছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইএসওএইচআর আরও জানিয়েছে, সৌদির বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা বিদেশি বন্দী রয়েছেন। খামিস মুশাইত কারাগারে ৫৮ জন ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে পাঁচ ইথিওপীয় ও পাঁচ সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে আটজন মিসরীয় বন্দী রয়েছেন।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ
ইএসওএইচআর বলেছে, এসব বন্দীর মামলায় পেশাদার দোভাষীর অভাব, আইনি সহায়তা না পাওয়া এবং বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে না পারার মতো সমস্যা রয়েছে। সংস্থাটির দাবি, অনেক আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগও পাননি।
সংস্থাটির সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন বন্দী জানিয়েছেন, তাঁরা সব সময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কার মধ্যে থাকেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রত্যাশী বন্দীদের অনেক সময় অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখা হয় এবং বাইরের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর হঠাৎ তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে নিয়ে যাওয়া হয়।
ইএসওএইচআরের মতে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার এবং এ বিষয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

