কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনায় দুই কিশোরসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
মরদেহ উদ্ধারের ৩১ দিনের মাথায় গত ২০ অক্টোবর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এতে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন, মো. সিয়াম এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরকে আসামি করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, তদন্তে চারজনের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
অভিযোগপত্রে চারজনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। দুই কিশোরকে শিশু আইনের আওতায় শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তুহিনকে মূল পরিকল্পনাকারী বলছে পুলিশ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান অভিযুক্ত। অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনায় সিয়ামও যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের দাবি, তিনজন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন। সিয়াম হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। তুহিন এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
অপ্রতিমের পরিবারের কাছে অভিযোগপত্রের পুরো বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে দুই কিশোরের বয়স নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত বয়স নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছিল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে পরিবার।
দ্রুত বিচার চায় পরিবার
অপ্রতিমের বাবা ও মামলার বাদী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, অভিযোগপত্র কখন দেওয়া হবে, তা জানতে তিনি তিন দিন আগে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তাঁকে পূজার ছুটি শেষ হওয়ার পরপরই অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
পরে ২০ অক্টোবর রাতে তদন্ত কর্মকর্তা তাঁকে ফোন করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি জানান।
ফিরোজ শাহরিয়ারের ভাষ্য, অপ্রতিমকে ঘিরেই তাঁদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন হত্যাকারীরা কেড়ে নিয়েছে। তিনি দ্রুত বিচার শেষে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, পুলিশ সুপারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং ৩১ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
তবে শারদীয় দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির কারণে অভিযোগপত্র দেওয়ার পরপরই আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয়নি। ছুটি শেষে রোববার থেকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
যেভাবে অপ্রতিমকে হত্যার অভিযোগ
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা নগরের কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম। সে কোটবাড়ির বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পনা করে ওই নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে ফোন কেড়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশের দাবি।
নিখোঁজ হওয়ার পর বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তুহিনকে শনাক্ত করার কথা জানায় পুলিশ। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় বলে তদন্তকারীদের দাবি।
মামলার তদন্তে প্রথমে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সিয়ামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন তার বাসার খাটের তোশকের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছিল পুলিশ।

