সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ কর সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতি হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় প্রতিষ্ঠানটির আয়করসংক্রান্ত নথিপত্র জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।
দুদকের দাবি, সিআরআইয়ের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান সংগ্রহ, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে আয়কর সুবিধা গ্রহণ এবং সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে প্রতিষ্ঠানটির আয়কর নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে আদালতকে জানানো হয়।
মামলায় যাদের নাম রয়েছে
দুদকের করা মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়াও আরও ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
তারা হলেন সিআরআইয়ের ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির বিন শামস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং কর আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য রওশন আরা আক্তার।
দুদকের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে সিআরআই বিভিন্ন কোম্পানি থেকে অনুদান সংগ্রহ করেছে এবং প্রভাব খাটিয়ে আয়কর সুবিধা নিয়েছে। এসব আর্থিক কর্মকাণ্ডে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
২৩ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৪৫ কোটি টাকার বেশি অনুদান
আদালতে জমা দেওয়া দুদকের আবেদন অনুযায়ী, সিআরআই করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমের আওতায় ২৩টি কোম্পানির কাছ থেকে মোট ৪৫ কোটি ৩৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির আয়করসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, ২০১৩-১৪ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত সিআরআইয়ের মোট আয় ছিল ১০০ কোটি ৩১ লাখ ৪০ হাজার ৪৮৬ টাকা।
দুদকের অভিযোগ, এই অর্থের মধ্যে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ৫৯ হাজার ৫২১ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অর্থের উৎস, ব্যয়ের হিসাব এবং প্রকৃত ব্যবহার যাচাই করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।
২৫ ব্যাংক হিসাবে ৪৩৯ কোটি টাকার বেশি লেনদেন
সিআরআইয়ের ব্যাংক হিসাবগুলোতেও বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে দুদক।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটির নামে থাকা ২৫টি ব্যাংক হিসাবে ২৪৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বেশি জমা হয়েছে। একই সময়ে এসব হিসাব থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ১৯১ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি।
সব মিলিয়ে ব্যাংক হিসাবগুলোতে লেনদেনের পরিমাণ ৪৩৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
দুদক এসব লেনদেনের বৈধতা, অর্থের উৎস এবং অর্থ কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে অনুদান হিসেবে পাওয়া অর্থ ও ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের মধ্যে কোনো অনিয়ম রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আয়কর পরিশোধ না করায় সরকারের ক্ষতির অভিযোগ
শুধু অনুদান সংগ্রহ কিংবা অর্থ আত্মসাৎ নয়, সিআরআইয়ের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে আয়কর সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে আয়কর সুবিধা দেওয়ার জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
সংস্থাটির দাবি, ৩৬ লাখ ৫২ হাজার ৭৪২ টাকা আয়কর পরিশোধ না করায় সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই কর সুবিধা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
যেসব আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক এ কে এম মুর্তজা আলী সাগর আদালতে আয়কর নথি জব্দের আবেদন করেন।
আবেদনে তিনি জানান, অভিযোগগুলোর সঠিক তদন্তের জন্য সিআরআইয়ের আয়করসংক্রান্ত মূল নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সংগ্রহ করা জরুরি।
এসব নথি ঢাকার কর অঞ্চল-৬-এর সার্কেল-১১৬-এ সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ৫৭৫৯৪১৯১৬৩০৪।
দুদক ২০২৫-২৬ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর ফাইলের স্থায়ী ও বিবিধ অংশসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি জব্দের অনুমতি চেয়েছিল।
আবেদন পর্যালোচনা করে আদালত প্রয়োজনীয় নথিপত্র জব্দের আদেশ দেন।
দুর্নীতি ও অর্থপাচার আইনে মামলা
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, মামলাটি দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় দায়ের করা হয়েছে।
মামলায় সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং সন্দেহজনক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
তবে আদালতের আয়কর নথি জব্দের আদেশকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত তদন্তের প্রয়োজনে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সংগ্রহের একটি আইনি পদক্ষেপ।
এখন জব্দ করা নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং অনুদানের হিসাব পর্যালোচনার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করবে দুদক।
তদন্তে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।

