নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, বুয়েটের আবরার ফাহাদ, পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎ দাস এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
উচ্চ আদালতে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা এসব মামলার আপিল দ্রুত শুনানির জন্য ইতিমধ্যে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। চার মামলার মধ্যে সাত খুনের আপিল শুনানি শুরু হবে ১৭ নভেম্বর। আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার শুনানি ২৪ নভেম্বর, মেজর সিনহা হত্যা মামলার ১ ডিসেম্বর এবং বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার ৮ ডিসেম্বর নির্ধারিত হয়েছে।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাসসকে বলেন, সমাজ ও সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়া এসব মামলা দ্রুত চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে। নির্ধারিত তারিখে শুনানি শুরু হয়ে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
সাত খুনের আপিল শুনানি ১৭ নভেম্বর
নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিলের শুনানি ১৭ নভেম্বর হবে। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত এ দিন নির্ধারণ করেন।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। ঘটনাটি দেখে ফেলায় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক মো. ইব্রাহিমও অপহৃত হন।
তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন উদ্ধার হয় আরও একটি মরদেহ।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলায় র্যাব ১১ এর সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন ও কমান্ডার এম এম রানা এবং নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আরও নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরে হাইকোর্ট ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ১১ জনের সাজা পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। আরও নয়জনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজাও বহাল থাকে।
আবরার হত্যা মামলার শুনানি ২৪ নভেম্বর
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি হবে ২৪ নভেম্বর। গত ১৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত এ দিন নির্ধারণ করেন।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১ মামলায় ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টও ওই সাজা বহাল রাখেন।
এখন হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।
মেজর সিনহা হত্যা মামলার শুনানি ১ ডিসেম্বর
অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি হবে ১ ডিসেম্বর।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা।
২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি বিচারিক আদালত মামলার ১৫ আসামির মধ্যে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাতজনকে খালাস দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ২ জুন হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এখন আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে মামলাটি।
বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার শুনানি ৮ ডিসেম্বর
পুরান ঢাকার দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিলের শুনানি হবে ৮ ডিসেম্বর। গত ১৯ অক্টোবর চেম্বার আদালত এ দিন নির্ধারণ করেন।
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর অবরোধ চলাকালে বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ৪ মামলায় ২১ আসামির মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
২০১৭ সালের ৬ আগস্ট হাইকোর্ট আট মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রাখেন। চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয় এবং দুজনকে খালাস দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া দুই আসামিও হাইকোর্টে খালাস পান।
সাগর রুনি মামলায় তদন্ত শেষ করার নির্দেশ
এদিকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করে আগামী বছরের ২৯ এপ্রিল অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
ওই দিন টাস্কফোর্সের প্রধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে মামলার নথিপত্রসহ আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, সরকার কাউকে রক্ষা বা কোনো তথ্য গোপন করতে চায় না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই সরকারের লক্ষ্য।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় খুন হন সাগর ও রুনি। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও মামলাটির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
এক দশক পর তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার
কুমিল্লার তনু হত্যা মামলাতেও প্রায় এক দশক পর নতুন অগ্রগতি এসেছে। মামলায় সাবেক সেনাসদস্য সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে সেনানিবাসের একটি ঝোপ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের তদন্তাধীন। তনু হত্যার সময় হাফিজুর রহমান কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।
এ মামলার আরও দুই অভিযুক্ত সাবেক সেনাসদস্য মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহীন আলমের বিরুদ্ধে গত ১ সেপ্টেম্বর রেড নোটিশ জারি করেছে ইন্টারপোল।

