বাংলাদেশে অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রায়ই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অনেককে মন্ত্রীর একান্ত সচিব বা সহকারী একান্ত সচিব করা হয়। এই পদায়ন হয় প্রজ্ঞাপন বা স্মারকের মাধ্যমে। প্রেষণের মেয়াদ শেষ হলে তাঁরা আবার বিচারকের আসনে ফেরেন। এই চর্চা বহু বছর ধরে চলছে। এখন আইনের দৃষ্টিতে এর বৈধতা ও যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রশ্নটা শুধু একটি প্রশাসনিক নিয়মের নয়। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন। বিচারক যাঁদের মামলা শোনেন, সেই সরকারই তাঁকে নিজের দপ্তরে কাজে লাগাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ জন্মায়। সন্দেহ জন্মালে আদালতের রায়ের গ্রহণযোগ্যতাও কমে।
বিচারকরা আলাদা পথে নিয়োগ পান
একসময় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের জন্য কর্মকর্তা নেওয়া হতো। তখন বিচার বিভাগে নিয়োগ পেতেন মুন্সেফ, পরে সহকারী জজ। পরে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের আলাদা পরীক্ষা চালু হয়। এখন সহকারী জজ নিয়োগ হয় সেই পরীক্ষার মাধ্যমে। এটি একটি ভালো সংস্কার বলে অনেকে মনে করেন।
কিন্তু আলাদা পরীক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল বিচার বিভাগকে আলাদা পরিচয় দেওয়া। সেই বিচারককে যদি পরে নির্বাহী বিভাগে পাঠানো হয়, তাহলে ওই উদ্দেশ্যই দুর্বল হয়ে যায়। নিয়োগে স্বাতন্ত্র্য থাকবে, অথচ কর্মজীবনে স্বাতন্ত্র্য থাকবে না, এটা সংগতিপূর্ণ নয়। আইনজীবীদের একটি বড় অংশ এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
মন্ত্রীর পিএস হলে নিরপেক্ষতা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়
পিএস বা এপিএস মন্ত্রীর দাপ্তরিক কাজ সামলান। তিনি ফাইল দেখেন, নির্দেশ পৌঁছে দেন এবং মন্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। এই কাজে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। মানুষের স্বভাবই এমন। কিন্তু বিচারকের জন্য এই ঘনিষ্ঠতা ঝুঁকির কারণ।
পরে ওই বিচারক আদালতে ফিরে এলে তাঁর সামনে সরকারি স্বার্থের মামলা আসতে পারে। তখন মানুষ ভাববে, তিনি কি আগের মন্ত্রীর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবেন? রায় সঠিক হলেও এই প্রশ্ন থেকে যায়। বিচারব্যবস্থায় প্রশ্ন ওঠাটাই ক্ষতির শুরু। কারণ আস্থা একবার নড়ে গেলে ফেরানো কঠিন।
সরকারি দপ্তরের সংস্কৃতি এবং ফিরে আসার ঝুঁকি
সরকারি অফিসে সেবা পাওয়া অনেক সময় সহজ নয়। তদবির, ফোন, পরিচয় ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা তিক্ত। বিচারক সেই পরিবেশে কয়েক বছর কাটালে তার প্রভাব পড়তে পারে। এটি লেখকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।
আরেকটি প্রশ্ন আছে। আগের রাজনৈতিক বস যদি পরে কোনো অনুরোধ নিয়ে আসেন, তখন বিচারক কীভাবে সামলাবেন? সবাই হয়তো দৃঢ় থাকবেন। তবে ব্যবস্থাটা এমন হওয়া উচিত যেন কাউকে এই পরীক্ষায় পড়তেই না হয়। ভালো আইনি কাঠামো ব্যক্তির সততার ওপর নির্ভর করে না। সে কাঠামো ঝুঁকিটাই আগে থেকে সরিয়ে দেয়।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের দৃষ্টান্ত
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। এরপর আপিল বিভাগে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলা শুনানির জন্য আসে। তিনি চাইলে বেঞ্চে বসতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন।
কারণ হিসেবে বলা হয়, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী থাকার সময় ওই বিষয়ের ফাইল তাঁর হাত দিয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি মনে করেছেন, বিচারকের আসনে বসা ঠিক হবে না। এই সিদ্ধান্ত বিচারকের নৈতিক দায়বোধের একটি বড় উদাহরণ। লেখকের মতে, সব বিচারকের কাছ থেকেই এমন মান প্রত্যাশিত। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন আত্মসংযম আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই আইনি বিধান দরকার।
সংবিধান কী বলে
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখতে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ। সরাসরি আদালতে বলবৎযোগ্য না হলেও এর গুরুত্ব অনেক। আদালত বহু রায়ে এটিকে সংবিধানের ব্যাখ্যায় কাজে লাগিয়েছেন।
এর পাশাপাশি ১১৬ক অনুচ্ছেদ বলে, বিচারকরা বিচারিক দায়িত্ব পালনে স্বাধীন থাকবেন। তাঁরা শুধু সংবিধান ও আইনের অধীন। ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার কথা আছে। ১০৯ অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধানের ক্ষমতার কথা আছে। এই বিধানগুলো একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, বিচারকদের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব রাখার সুযোগ সংবিধান দেয় না।
মাসদার হোসেন মামলার নির্দেশনা
বিচার বিভাগ আলাদা করার বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় মাসদার হোসেন মামলা। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১২ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনার উদ্দেশ্য ছিল অধস্তন বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা। রায়ে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের নিয়োগ, পদায়ন ও শৃঙ্খলা বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা থাকবে।
এখন প্রশ্ন, মন্ত্রীর পিএস পদে বিচারক পাঠানো এই রায়ের চেতনার সঙ্গে মেলে কি না। বিচারক নিজের দপ্তরের বাইরে গিয়ে সরাসরি নির্বাহী কর্তৃপক্ষের অধীনে কাজ করছেন। এতে পৃথকীকরণের লক্ষ্যই দুর্বল হয়। লেখকের মতে, এটি রায়ের নির্দেশনার পরিপন্থী। এছাড়া ২০২৫ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালার পরিধিতেও এমন পদায়নের স্পষ্ট ভিত্তি নেই বলে তিনি মনে করেন।
আইনি যুক্তি: পক্ষপাতের আশঙ্কাই যথেষ্ট
আইনে একটি পুরোনো নীতি আছে। ন্যায়বিচার শুধু করলেই হবে না, তা যে করা হয়েছে সেটাও মানুষকে দেখতে ও বুঝতে হবে। ইংল্যান্ডের একটি বিখ্যাত মামলায় এই নীতি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের আদালতও নানা সময়ে এই নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
আরেকটি নীতি হলো, কেউ নিজের মামলার বিচারক হতে পারে না। এর বিস্তৃত অর্থ হলো, যাঁর সঙ্গে স্বার্থ বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাবনা আছে, তিনি বিচার থেকে সরে থাকবেন। এখানে প্রকৃত পক্ষপাত প্রমাণ করা জরুরি নয়। যুক্তিসংগত আশঙ্কা থাকলেই যথেষ্ট। মন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করা বিচারক ভবিষ্যতে সরকারি মামলায় বসলে এই আশঙ্কা তৈরি হতেই পারে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা
জাতিসংঘের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ক মৌলিক নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। বিচারকের কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ চলবে না। বাঙ্গালোর বিচারিক আচরণবিধিতেও স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও শালীনতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই মানদণ্ড অনুযায়ী বিচারকের আচরণ শুধু সঠিক হলে চলবে না, সঠিক দেখাতেও হবে।
লেখক যুক্তরাজ্যে ৩৭ বছর ধরে বসবাস করছেন এবং প্রায় তিন দশক আইন পেশায় আছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায় সেখানে কোনো বিচারককে মন্ত্রীর পিএস বা এপিএস করা হয় না। যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক সংস্কার আইন ২০০৫ বিচার বিভাগের ধারাবাহিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মন্ত্রীদের ওপর দিয়েছে। তাঁদের বিচারকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করতে নিষেধ করা হয়েছে। লেখকের মতে, এই কারণেই সেখানে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বেশি।
সরকারের সম্ভাব্য যুক্তি এবং তার জবাব
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হতে পারে, প্রেষণ একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। বিচারকদের আইনি জ্ঞান মন্ত্রণালয়ের কাজে সহায়ক। তাঁরা দক্ষ ও বিশ্বস্ত বলেই তাঁদের নেওয়া হয়। সংবিধানে বিচারক প্রেষণে পাঠানোর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই বলেও কেউ যুক্তি দিতে পারেন।
এর জবাবে বলা যায়, সংবিধান পড়তে হয় তার মূল উদ্দেশ্য মাথায় রেখে। স্পষ্ট নিষেধ না থাকলেই কোনো চর্চা বৈধ হয়ে যায় না। ২২ অনুচ্ছেদ ও ১১৬ক অনুচ্ছেদের লক্ষ্য হলো বিচারকদের নির্বাহী প্রভাবমুক্ত রাখা। আইনি জ্ঞানের প্রয়োজন থাকলে আইনজীবী বা আইন কর্মকর্তা নেওয়ার বিকল্প আছে। তাই বিচারকদের পাঠানোর কোনো অপরিহার্য প্রয়োজন নেই।
সমাধানের প্রস্তাব
লেখক প্রস্তাব করেছেন, মন্ত্রীদের পিএস ও এপিএস পদে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নেওয়া হোক। প্রয়োজনে বিসিএসের মাধ্যমে ওই ক্যাডারে আরও লোক নিয়োগ দেওয়া হোক। দেশে দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা পাওয়া কঠিন কিছু নয়। আইনি দক্ষতা প্রয়োজন হলে স্বতন্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে আইনজীবীদের মধ্য থেকেও নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
এর পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় একটি স্পষ্ট নীতিমালা করতে পারে। সেখানে বলা থাকবে, বিচারক কোন কোন ক্ষেত্রে কোথায় যেতে পারবেন এবং কোথায় পারবেন না। রাজনৈতিক পদে বিচারক পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করা যায়। স্পষ্ট নিয়ম থাকলে বিচারক ও সরকার দুই পক্ষই বিতর্ক থেকে রক্ষা পাবে।
শেষ কথা
বিচার বিভাগ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। সেখানে সামান্য সন্দেহও বড় ক্ষতি করতে পারে। বিচারক মন্ত্রীর পিএস হলে হয়তো সঙ্গে সঙ্গে কোনো ক্ষতি দেখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে আস্থা কমতে থাকে। আইন, সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের রায় সবই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে। তাই এই চর্চা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

