আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ এবার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সাজাপ্রাপ্তদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারকে চিঠি দেবে প্রসিকিউশন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে সরকারের কাছে চিঠি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের ও হানিফের মামলার রায়ে তাঁদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং তা বিক্রির উদ্যোগ নিতে সরকারকে বলা হবে।
বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হবে।
তবে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের পর তা বিক্রি করে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের নির্দিষ্ট পদ্ধতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে স্পষ্ট নয়। আইনের ২০(এ) ধারায় ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও জরিমানার সুযোগও আছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট অথবা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারার বিধান কাজে লাগানো যেতে পারে। রায়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনসহ এসব আইন অনুসরণের নির্দেশ থাকলে সম্পত্তি বিক্রি ও অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ হবে।
শেখ হাসিনার মামলায় শুরু
শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মামলার রায়ে প্রথমবারের মতো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ আসে।
ওই রায়ে দেশে থাকা তাঁদের সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রাপ্য অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।
এরপর আরও কয়েকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একই ধরনের নির্দেশ এসেছে।
চানখারপুলে নিহতদের পরিবারকে অর্থ
চানখারপুলে হত্যাকাণ্ডের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, শেয়ার এবং স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
বাজেয়াপ্ত অর্থ নিহত ছয়জনের পরিবারের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
এই মামলায় নিহত ছয়জন হলেন শাহরিয়ার খান আনাস, শহীদ শেখ মাহাদী হাসান জুনায়েদ ওরফে মোস্তাকিন, শহীদ মো. ইয়াকুব, শহীদ রাকিব হাওলাদার, শহীদ মোহাম্মদ ইসমামুল হক এবং শহীদ মানিক মিয়া ওরফে শাহরিক।
মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তিন আসামি হলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আক্তারুল ইসলাম।
আশুলিয়ার মামলায় সাইফুল ইসলামের সম্পত্তি
আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের জন্য সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের দেশে থাকা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে সাতজনকে এক লাখ টাকা করে, একজনকে ৫০ হাজার টাকা এবং ছয়জনকে পাঁচ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগতভাবে ক্ষতিপূরণ বিতরণ নিশ্চিত করতে বলেছেন। একই সঙ্গে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, উদ্ধার ও ক্ষতিপূরণ বিতরণের অগ্রগতি জানিয়ে প্রতিপালন প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ওবায়দুল কাদেরসহ পাঁচজনের সম্পত্তি
ওবায়দুল কাদেরসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
অন্য চারজন হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল।
রায়ে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের অথবা তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
হানিফসহ চারজনের সম্পত্তি
মাহবুব উল আলম হানিফের মামলাতেও তাঁর এবং অপর তিন আসামির অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ এসেছে।
অন্য আসামিরা হলেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান।
এই মামলায় হানিফকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর তিনজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায়ে তাঁদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এখন এসব রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, বিক্রি এবং ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় প্রসিকিউশন।

