ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ডাকাতির মতো অপরাধের বিচার দ্রুত করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে এসব অপরাধের বিচারাধীন মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে পারবে সরকার। এ জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ সংশোধনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে খসড়াটির ওপর বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া শুরু করেছে। মতামত গ্রহণ শেষে এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে আগামী সংসদ অধিবেশনে সংশোধনীটি পাসের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
আইন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজি, দস্যুতা, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের মামলার বিচার দীর্ঘদিন ধরে চললে অপরাধ দমন বাধাগ্রস্ত হয় এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতেই আইনটি যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যেসব মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেওয়া যাবে
বর্তমান আইনের ৬ ধারায় হত্যা, ধর্ষণ, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক দ্রব্য ও মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত অপরাধের বিচারাধীন মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এ তালিকা আরও বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ৩৮৪ থেকে ৩৮৯ ধারায় বর্ণিত বলপূর্বক আদায় বা চাঁদাবাজির অপরাধ এবং ৩৯২ থেকে ৪০২ ধারায় বর্ণিত দস্যুতা ও ডাকাতির মামলাও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো যাবে।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধের মামলাও এই ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলা স্থানান্তর হলে সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। তবে অনিবার্য কারণে এ সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা সম্ভব না হলে ট্রাইব্যুনাল কারণ উল্লেখ করে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় নিতে পারে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টকে লিখিতভাবে জানাতে হয় এবং সরকারের কাছেও অনুলিপি পাঠাতে হয়।
এরপরও বিচার শেষ করা না গেলে কারণ উল্লেখ করে সর্বশেষ আরও ১৫ কার্যদিবস সময় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই সময়েও মামলা নিষ্পত্তি না হলে যে আদালত থেকে মামলাটি স্থানান্তর করা হয়েছিল, সেখানে ফেরত পাঠাতে হয়। সে ক্ষেত্রে ফেরত পাঠানোর কারণ সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারকে জানাতে হয়।
মামলাটি আগের আদালতে ফিরে গেলে ওই আদালতের অন্যান্য বিচারাধীন মামলার তুলনায় এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ডাকাতির ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে অপরাধীদের সাজা দৃশ্যমান করতে চায় সরকার। এতে সমাজে অপরাধের বিরুদ্ধে একটি বার্তা যাবে বলে মনে করছে সরকার। তাঁর মতে, সাধারণ ফৌজদারি আদালতে এসব মামলার বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে।
ছিনতাইয়ের ঘটনা ও অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে দেশে ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ঘটেছে। গত মার্চে এ ধরনের ঘটনা ছিল ১ হাজার ৩২২টি। মে মাসে ১ হাজার ২৭৬টি, জুনে ১ হাজার ৩১৮টি এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৩২৭টি ঘটনা ঘটেছে। এসব অপরাধের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ঘটনা সবচেয়ে বেশি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি বিভাগে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা এখন ১ হাজার ৩৮৭। ছয় মাস আগে এ সংখ্যা ছিল ৯৮৯। অর্থাৎ, এ সময়ে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন ছিনতাইকারী তালিকাভুক্ত রয়েছে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, তালিকাভুক্তদের প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধে এক থেকে সাতটি মামলা রয়েছে। তাঁদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে মুক্তির পর আবার ছিনতাইয়ে জড়াচ্ছেন। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, তালিকার বাইরেও রাজধানীতে এক হাজারের বেশি সক্রিয় ছিনতাইকারী রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ছিনতাইয়ের সময় তাঁদের কেউ কেউ ছুরি, চাপাতি ও সামুরাইয়ের মতো ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক কামারুম মুনিরা কালবেলাকে বলেন, ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি ও ছিনতাইয়ের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। দ্রুত বিচার হলে অপরাধীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হবে এবং সমাজেও একটি বার্তা যাবে। এতে ধীরে ধীরে এ ধরনের অপরাধ কমতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
আগে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা
এর আগে গত ১৫ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দণ্ডবিধির বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা দূর করতে আইন সংশোধন অথবা নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। মোবাইল কোর্টে সামান্য শাস্তির পরিবর্তে কঠোর সাজা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও আইনি সংস্কারের চিন্তা রয়েছে।
চাঁদা আদায়কারী ও তাদের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি। এসব ক্যামেরায় ধারণ করা অডিও ও ভিডিও আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংসদীয় কমিটিকে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

