হত্যাচেষ্টা মামলায় জামিন না মেলায় ঢাকার এক বিচারিক হাকিমকে প্রকাশ্য আদালতেই ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ বলে তকমা দিয়েছেন বিএনপিপন্থি কয়েকজন আইনজীবী। শুধু তাই নয় আদালতের পরিবেশ ক্ষুণ্ন করে তারা বিচারককে লক্ষ্য করে উচ্চস্বরে গালিগালাজ করেছেন এবং হুমকি দিয়েছেন। শনিবার দুপুরে ঢাকার বিচারিক হাকিম আদালতে এই ঘটনা ঘটে।
কেরাণীগঞ্জ মডেল থানায় দায়ের করা এক হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি হানিফ মেম্বার গত ১২ মে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। বিচারক তখন তার জামিন আবেদন খারিজ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে গত বৃহস্পতিবার হানিফের পক্ষে নতুন করে জামিন আবেদন করেন কয়েকজন আইনজীবী। শনিবার সেই আবেদনের শুনানি শেষে বিচারক পুনরায় জামিন নামঞ্জুর করলে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বিচারক জামিন আবেদন খারিজ করার পর আইনজীবী খোরশেদ আলমসহ কয়েকজন বিচারকের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তারা বিচারকের উদ্দেশে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’, ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ ইত্যাদি মন্তব্য করেন এবং আদালতের কার্যতালিকা ছুড়ে ফেলেন। মামুনের ভাষ্যমতে, বিচারক যখন বলেন ‘অর্ডার তো দিয়েই ফেলেছি পুনরায় শুনানির প্রয়োজন হলে সিজেএম স্যারের কাছে বিশেষভাবে আবেদন করুন’, তখন আইনজীবীরা জোর করে শুনানি করতে চাইলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিচারকের অনুরোধ উপেক্ষা করে তারা প্রকাশ্যে হুমকি ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে দেখা যায় আইনজীবী খোরশেদ আলম বিচারকের সামনে এক নথি তুলে ধরে বলেন, “ঘটনার তারিখ, সময়, স্থান এক— দুইটা মামলা, বাদী আলাদা। এটা হয় নাকি?” এরপর তিনি এজলাস ত্যাগ করেন। তখন আবদুল খালেক মিলন নামে এক আইনজীবী বলেন, “৫ তারিখ শেখ হাসিনা পদত্যাগ না করলে আমরা গুম-খুন হতাম। আমরা ৮০ বছর বয়সের একজন লোককে স্যারেন্ডার করিয়েছি।” অন্য এক আইনজীবী বলেন, “আমরা শুনানি করে চলে গেছি। কিন্তু বিচারক জিআরওকে বলেন, ‘আপনি ভয় পেয়েছেন?’ আমরা কি এমন কিছু করেছি?”
আবদুল খালেক মিলন আরও বলেন, “এই চেয়ারে আপনি আজ আমাদের কারণেই বসা। আমরা গত ১৭ বছর ধরে কষ্ট করেছি।” তিনি দাবি করেন, ৪ আগস্টের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে তারা কোনো অন্যায় দাবি করেননি এবং ৫ আগস্টের পর থেকে কোনো কোর্টে তদবির করেননি।
এরপর এক আইনজীবী পুনরায় জামিনের জন্য আবেদন করেন এবং বিচারকের কাছে বলেন, “আপনি কাল শুনানির জন্য রাখেন, না হলে আমরাও বাঁচতে পারি না।” উত্তেজিত পরিবেশে এক আইনজীবীকে বলতে শোনা যায়, “যান যান”, তখন আরেকজন ধমকের সুরে বলেন, “চুপ।” এরপরই আইনজীবীদের কণ্ঠে শোনা যায়, “এ আওয়ামী লীগের দালাল।” এক পর্যায়ে এক আইনজীবী বিচারককে প্রকাশ্যে গালিও দেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী আবদুল খালেক মিলন বলেন, “বিচারক জিআরওকে ধমক দিয়েছেন, বলছেন সে ভয় পেয়েছে। আমরা তখন বলি, নেগেটিভ কিছু হলে রিকলের আবেদন করব। উনি সেটা রাখেননি, শুনেননি। বরং জিআরওকে দোষারোপ করেন।”
প্রসঙ্গত, কেরাণীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের বাসিন্দা ফজলুল হক গত ৬ মে একটি মামলা করেন হানিফ মেম্বারসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৭০-৮০ জনকে আসামি করে। মামলায় অভিযোগ করা হয় বাদী ১৩ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি নির্মাণ করেন যা দখলের পাঁয়তারা করে আসামিরা। গত ২৫ ও ২৭ জানুয়ারি তাকে গালিগালাজ করে জমি ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, গত ৫ মে আসামিরা তার বাড়িতে হামলা চালায়, কেয়ারটেকারকে হত্যা চেষ্টায় হাত-পা বেঁধে ফেলে এবং তার স্ত্রীর প্রতি যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটায়। তারা বাড়ির দেয়াল ভেঙে জিনিসপত্র লুটপাট করে, এতে প্রায় ১০-১১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে এক কোটি টাকা চাঁদার দাবিও করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
ফজলুল হক আরও অভিযোগ করেন, হানিফ মেম্বার দীর্ঘদিন ধরে শাক্তা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হিসেবে ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা অনিয়ম ও দখলদারি করে আসছেন। তার দাবি, হানিফ মেম্বার আগে খুব সাধারণ অবস্থা থেকে উঠে এসে এখন কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তিনি বহু মানুষের জমি দখল করেছেন, এমনকি মসজিদের জমিও জাল কাগজে বিক্রি করেছেন। এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ২৪ শতাংশ জমিও জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের করে নিয়েছেন। তিতাস গ্যাসের সংযোগের নামে হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। যদিও পরে তিতাস কর্তৃপক্ষ এসে সেই অবৈধ লাইন কেটে দেয়।
ফজলুল হক জানান, তিনি হজে থাকাকালীন হানিফ তার বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ একাধিক মামলা দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, হানিফ জেলে বসেই মামলা তুলে নিতে তাকে হুমকি দিচ্ছেন। জামিন শুনানিতে বিরোধিতা করতে গিয়েও তিনি ও তার আইনজীবীরা হুমকির শিকার হয়েছেন। তার দাবি, কেরাণীগঞ্জে সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল ইসলামের চেয়েও হানিফের প্রভাব বেশি।
এই ঘটনা আদালতের শালীনতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি আদালতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিচারককে লক্ষ্য করে প্রকাশ্য আদালতে এমন হুমকি ও অবমাননাকর আচরণ বিচার বিভাগের মর্যাদার ওপর আঘাত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

