রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পদমর্যাদাক্রম বা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স নিয়ে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন আগামী ১ জুলাই শুনানির জন্য নির্ধারিত হয়েছে।
রোববার ১৮ মে, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের বেঞ্চ এই শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন। এর আগে রায় পুনর্বিবেচনার দ্রুত শুনানির জন্য আবেদন করে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার মামলাটি কার্যতালিকায় ওঠে।
রিভিউ আবেদনে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার সালাউদ্দিন দোলন। বিচারকদের সংগঠন জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার নিহাদ কবির ও অ্যাডভোকেট প্রবীর নিয়োগী। অন্যদিকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের পক্ষ থেকে শুনানিতে অংশ নেন সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম ও ব্যারিস্টার এম. আবদুল কাইয়ূম।
২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রের পদমর্যাদাক্রম সংক্রান্ত মামলায় রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয় ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর। সেখানে সাংবিধানিক পদধারীদের অধিক অগ্রাধিকার দিয়ে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স পুনর্বিন্যাসের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায়টি লিখেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, সংবিধান হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। তাই রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত পদক্রমের শুরুতেই সাংবিধানিক পদধারীদের যথাযথ স্থান দেওয়া উচিত। এই অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির পদক্রম এক ধাপ বাড়িয়ে সংসদ স্পিকারের সমমর্যাদায় রাখা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর উত্তম পদকপ্রাপ্তদের উপযুক্ত অবস্থানে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়।
রায়ের ৬২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুচ্ছেদের শেষাংশে বলা হয়, জেলা জজ ও সমমর্যাদার বিচারকদের পদক্রমে ২৪ নম্বর থেকে উন্নীত করে ১৬ নম্বরে আনা হবে, যা সচিবদের সমান মর্যাদা। অতিরিক্ত জেলা জজদের অবস্থান হবে ১৭ নম্বরে। এর আগে অতিরিক্ত জেলা জজদের পদক্রমে কোনো স্থান ছিল না। ১৯৮৬ সালের পদক্রম অনুযায়ী জেলা ও দায়রা জজদের ২৪ নম্বরে রাখা হলেও পরবর্তীকালে তাদের নিচে রাখা হয় কমান্ড্যান্ট মেরিন একাডেমি, জেলা প্রশাসক, ডিআইজি ও বিএসটিআইয়ের পরিচালকের পরে।
রায়ে আরও বলা হয়, এই পদক্রম শুধু রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং কোনো নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়বে না।
উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে প্রথম ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স জারি করে, যা সময়ে সময়ে সংশোধন হয়। সর্বশেষ সংশোধন হয় ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে। এই সংশোধিত সংস্করণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৬ সালে রিট করেন বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব মো. আতাউর রহমান। তার অভিযোগ ছিল, প্রশাসন ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তাকে সংবিধান স্বীকৃত ও সংজ্ঞায়িত পদধারীদের ওপরে রাখা হয়েছে, যা অসাংবিধানিক।
২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট ৮ দফা নির্দেশনাসহ ১৯৮৬ সালের সংশোধিত ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অবৈধ ঘোষণা করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২০১১ সালে আপিল করে। সেই আপিলের শুনানি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে হয়। তখন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন বিশেষ কৌঁসুলি আবদুর রব চৌধুরী, আর রিটকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান।
রায়ে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি ও সংসদ স্পিকার দুজনেই ছিলেন ৪ নম্বরে। সে সময় উপরাষ্ট্রপতি ২ নম্বরে ছিলেন। পরবর্তীকালে উপরাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত হলে প্রধানমন্ত্রী ২ নম্বরে আসেন। তবে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই পরে স্পিকারকে ৩ নম্বরে রেখে প্রধান বিচারপতিকে ৪ নম্বরে নামিয়ে দেওয়া হয় যা সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই প্রধান বিচারপতিকে স্পিকারের সঙ্গে ৩ নম্বরে রাখা সংবিধানসম্মত বলে রায়ে মন্তব্য করা হয়।
এছাড়াও রায়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের অবস্থান এক ধাপ উন্নীত করে ৭ নম্বরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তারা বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ৮ নম্বরে রয়েছেন। হাইকোর্টের বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেল ৮ নম্বরে থাকবেন। এর আগে হাইকোর্টের বিচারপতিরা ৯ নম্বরে ছিলেন।
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, সংসদ সদস্য ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে তিন ধাপ এগিয়ে ১২ নম্বরে এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যানকে এক ধাপ এগিয়ে ১৫ নম্বরে রাখতে হবে। বর্তমানে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক ১৫ নম্বরে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে এবং পিএসসির চেয়ারম্যান ১৬ নম্বরে পুলিশের মহাপরিদর্শকের সঙ্গে রয়েছেন।
রায়ে আশা প্রকাশ করা হয়, সরকার আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এই প্রসঙ্গে আগামী ১ জুলাইয়ের শুনানিতে আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন তা হবে ভবিষ্যতের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স নিয়ে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার ও কর্তৃত্ব কাঠামো নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

