বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের একজন মো. মোর্শেদ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে খালাস চেয়ে আবেদন করেছেন। ১৯ মে, সোমবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই আপিল দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু।
এর আগে, গত ১৬ মার্চ হাইকোর্ট বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায় অপরিবর্তিত রাখেন। এতে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ বহাল থাকে। বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কে বি রুমি, জহিরুল ইসলাম সুমন ও নূর মোহাম্মদ আজমী এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার সুমাইয়া আজিজ। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন মাসুদ হাসান চৌধুরী ও আজিজুর রহমান দুলু। রায় ঘোষণার সময় আদালতে আবরার ফাহাদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ জন আসামির মধ্যে রয়েছেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৩তম ব্যাচ), সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার অপু (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির (ওয়াটার রিসোর্সেস, ১৬তম ব্যাচ), ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন (মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৫তম ব্যাচ), উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল (বায়োমেডিক্যাল, ১৬তম ব্যাচ), মুনতাসির আল জেমি (এমআই বিভাগ), মোজাহিদুর রহমান (ইইই, ১৬তম ব্যাচ), হোসেন মোহাম্মদ তোহা (মেকানিক্যাল, ১৭তম ব্যাচ), এহতেশামুল রাব্বি তানিম (সিভিল, ১৭তম ব্যাচ), শামীম বিল্লাহ (মেরিন, ১৭তম ব্যাচ), মাজেদুর রহমান মাজেদ (এমএমই, ১৭তম ব্যাচ), খন্দকার তাবাক্কারুল ইসলাম তানভীর (মেকানিক্যাল, ১৭তম ব্যাচ), মোর্শেদ-উজ-জামান জিসান (ইইই, ১৬তম ব্যাচ), এস এম নাজমুস সাদাত (মেকানিক্যাল, ১৭তম ব্যাচ), মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম (মেকানিক্যাল, ১৭তম ব্যাচ), মিজানুর রহমান (ওয়াটার রিসোর্সেস, ১৬তম ব্যাচ), শামছুল আরেফিন রাফাত (মেকানিক্যাল), মুজতবা রাফিদ (কেমিক্যাল, উপ-দপ্তর সম্পাদক) এবং এসএম মাহামুদ সেতু (কেমিক্যাল)।
এছাড়া হাইকোর্টে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকা পাঁচ আসামি হলেন—ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ (সিভিল, ১৪তম ব্যাচ), গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না (মেকানিক্যাল, তৃতীয় বর্ষ), আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং), সদস্য আকাশ হোসেন (সিভিল, ১৬তম ব্যাচ) এবং মোয়াজ আবু হোরায়রা (সিএসই, ১৭তম ব্যাচ)।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মামলার ডেথ রেফারেন্স ও ৬ হাজার ৬২৭ পৃষ্ঠার মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয় অনুমোদনের জন্য। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা এরপর হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল ও জেল আপিল করেন। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তা কার্যকর করতে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয় এবং আসামিদের আপিলের সুযোগ থাকে।
মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয় ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি তা শেষ হয়। তারও আগে, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান দ্রুত শুনানির উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
আবরার হত্যার ঘটনা ঘটে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে, বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলে। ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন, ৭ অক্টোবর চকবাজার থানায় আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ ১৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। মাত্র ৩৭ দিনে তদন্ত সম্পন্ন করে তিনি ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
এ মামলা শুধু বুয়েট নয়, গোটা দেশের শিক্ষাঙ্গন ও সমাজে এক গভীর আলোড়ন তোলে। এখন হাইকোর্টের রায় অনুসারে সাজাপ্রাপ্তদের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে যার মাধ্যমে মামলাটি নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে।

