গাজীপুরের শ্রীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের এপিসি (আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার) গাড়ি ভাঙচুর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় ৬৪ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। একইসঙ্গে অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিকে মামলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে গাজীপুর শিল্প পুলিশের শ্রীপুর সাব জোনের উপপরিদর্শক (এসআই) সুশান্ত কুমার রায় বাদী হয়ে শ্রীপুর থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এর আগে বিক্ষোভ-সংঘর্ষের দিনই পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ২৩ জন শ্রমিককে আটক করেছিল, যাঁদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আজ বুধবার দুপুরে তাঁদের গাজীপুর আদালতে হাজির করা হয়।
শ্রীপুর শিল্প পুলিশের ইনচার্জ আবদুল লতিফ জানান, মামলায় কোনো নারী শ্রমিককে আসামি করা হয়নি। তবে তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে তাঁদেরও অভিযুক্ত করা হতে পারে।
শ্রমিক বিক্ষোভের সূচনা হয় সোমবার সন্ধ্যায় জিন্নাত নিটওয়্যার লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার এক শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। জানা গেছে, নয়নপুর নতুন বাজার এলাকার ওই কারখানার আটতলা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন শ্রমিক জাকির হোসেন (২৭)। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ৯টার দিকে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। জাকির নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার বাদেচিরাম গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
পরদিন মঙ্গলবার সকালে কারখানার অন্য শ্রমিকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁরা অভিযোগ করেন, জাকির ছুটি চেয়েছিলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁকে ছুটি না দিয়ে দুর্ব্যবহার করে। এই মানসিক চাপে পড়ে জাকির আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে দাবি করেন শ্রমিকেরা।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা কারখানার সামনে অবস্থান নেন এবং ভাঙচুরের চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাঁধে। এ সময় শ্রমিকরা কারখানার সামনে রাখা এপিসি গাড়ি ভাঙচুর করেন। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
একপর্যায়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। সংঘর্ষে পুলিশ, শিল্প পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য আহত হন। পরে সকাল ১১টার দিকে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি শান্ত রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিক্ষোভের বিস্তার ও বড় আকার ধারণ করায় শ্রমিক অসন্তোষকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ঘটনাটির ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রমিকদের ক্ষোভের পেছনে রয়েছে কারখানার ভেতরের অব্যবস্থাপনা, মানবিকতা বিবর্জিত আচরণ এবং দীর্ঘদিনের অস্বস্তিকর কর্মপরিবেশ। তাঁরা দাবি করছেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের বিচার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ও সহিংসতা এড়ানো যায়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতির পাশাপাশি কারখানা এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

