মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংসে ইসরায়েলের পাশে সামরিকভাবে দাঁড়ানোর কথা ভাবছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে তিনি আরও দুই সপ্তাহ সময় নিয়েছেন। এদিকে ইসরায়েল আগেই হামলা চালিয়েছে ইরানে। তাদের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। তাই আত্মরক্ষার জন্য আগাম হামলা চালানো হয়েছে।
কিন্তু জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের ওপর আগ্রাসন চালাতে পারে না। কেবল আত্মরক্ষার প্রয়োজন হলে, তাও সীমিত পরিসরে, বলপ্রয়োগের সুযোগ আছে। তবে আগে অবশ্যই শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। ব্যর্থ হলে, সিদ্ধান্ত নেবে নিরাপত্তা পরিষদ। তবে যদি কোনো দেশ আকস্মিকভাবে আক্রান্ত হয়, তখন আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে— এককভাবে বা মিত্রদের নিয়ে। ইরানে আগেভাগে হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার দাবি তাই এখন আন্তর্জাতিক আইনে যুক্তিসঙ্গত কি না, তা নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক। অনেক আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ইসরায়েলের হামলা বৈধ নয়।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক সদস্য মার্কো মিলানোভিচ বলেন, ইরান সরাসরি বা প্রক্সি বাহিনী দিয়ে ইসরায়েলকে আক্রমণ করেনি। সেক্ষেত্রে আত্মরক্ষার যুক্তি টেকসই নয়। আন্তর্জাতিক আইনের অপর এক বিশেষজ্ঞ, এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারিয়া গাভুনেলি বলেন, ‘সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আগাম আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ।’
তবে ব্যতিক্রম হিসেবে অনেকে পারমাণবিক অস্ত্রকে বিবেচনা করেন। গাভুনেলি বলেন, আত্মরক্ষার যুক্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েলকে প্রমাণ দিতে হবে ইরান সত্যিই পারমাণবিক বোমার খুব কাছাকাছি ছিল। যেমন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) কোনো রিপোর্ট। IAEA এখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেনি যে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে। তবে তারা ইরানের কর্মকাণ্ড যাচাই করতেও পারছে না, কারণ ২০২১ সাল থেকে ইরান তাদের সহযোগিতা করছে না।
২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময়ে ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) ট্রাম্প ২০১৮ সালে বাতিল করেন। এরপর চুক্তির কার্যকারিতা হ্রাস পায়। ৯ জুন IAEA প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানান, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দিচ্ছে না। কিছু জায়গায় ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও ইরান সন্তোষজনক জবাব দেয়নি। বরং প্রমাণ গোপনের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। তিনি জানান, ইরান এখন ৬০ শতাংশ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। একবার তো ৮৩.৭ শতাংশ পর্যন্ত গেছে। অথচ ৯০ শতাংশ হলেই তা পারমাণবিক অস্ত্রের উপযোগী হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী, ৫ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়াম না রাখার শর্ত ছিল। ১২ জুন IAEA গভর্নর বোর্ডে গৃহীত এক প্রস্তাবনায় বলা হয়, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করছে।
তবে গ্রোসি আবার বলেন, ‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ এই বক্তব্য দেন তিনি ইরানের আইনি হুমকির প্রেক্ষাপটে। ইরান পাল্টা দাবি করেছে, তারা এনপিটির (NPT) সদস্য এবং অস্ত্র তৈরি করবে না। তাদের কিছু স্থানে পাওয়া ইউরেনিয়াম নাশকতার ফল বলে দাবি করেছে তারা। তবে ইসরায়েলের হামলার পর ইরান তাদের সংসদে এনপিটি থেকে সরে আসার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে।
ইসরায়েল আগেও এমন হামলা চালিয়েছে। ১৯৮১ সালে তারা ইরাকের অসমাপ্ত পারমাণবিক চুল্লিতে হামলা চালায়। তখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছিল, এটি জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। ২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশও একই যুক্তিতে ইরাক আক্রমণ করেন। তিনি বলেছিলেন, ইরাক সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাঠাতে পারে। কিন্তু জাতিসংঘ এমন কোনো প্রমাণ পায়নি। পরে প্রমাণ মিলেওনি। ২০১৮ সালে ইসরায়েল জানায়, ২০০৭ সালে তারা সিরিয়ার একটি পারমাণবিক চুল্লিতে বোমা মেরেছিল। সেটিও আগাম আত্মরক্ষার যুক্তি দেখিয়ে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের দোটানায় পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হামলার সিদ্ধান্ত নিতে আরও সময় নিচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের প্রধান আইন উপদেষ্টা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী আক্রান্ত না হলে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান যৌক্তিক হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সংঘাত বিস্তৃত হয়, তার আগুন কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

