বিদেশে সম্পদ গড়ার পর তা আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন না করে এতদিন অনেকেই আইনের মারপ্যাঁচে পার পেয়ে গেছেন। ‘নিবাসী’ শব্দের ব্যাখ্যার ফাঁক গলে অনেকেই রক্ষা পেয়ে গেলেও এখন আর সে সুযোগ থাকছে না। ২০২৫ সালের অর্থ অধ্যাদেশে আয়কর আইনের ২১ ধারা সংশোধন করে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। এখন থেকে নিবাসী হোক কিংবা অনিবাসী, যে কেউ যদি জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হন এবং বিদেশে সম্পদ গড়ে থাকেন, সেটি আয়কর রিটার্নে দেখাতে হবে। অন্যথায় অনুসন্ধান, তদন্ত এবং জরিমানার মুখে পড়তে হবে।
২০২২ সালের জুলাই থেকে কর আইনে বলা হয়, বিদেশে সম্পদ থাকলে তা রিটার্নে দেখানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইনের ‘নিবাসী’ ব্যাখ্যা ঘিরে তৈরি হয় বিভ্রান্তি। অনেকেই দাবি করেন, তারা বাংলাদেশে ‘নিবাসী’ নন, তাই বিদেশি সম্পদের তথ্য প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ কেউ বাংলাদেশের নাগরিকত্বও ত্যাগ করেন। ফলে আইনের আওতায় তাদের আনা সম্ভব হচ্ছিল না। ২০২৫ সালের অর্থ অধ্যাদেশে ২১ ধারার উপধারা (১)-এ ‘নিবাসী বাংলাদেশী’র পরিবর্তে ‘করদাতা বা জন্মসূত্রে বাংলাদেশী ছিলেন বা আছেন’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এখন জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হলেও বিদেশে সম্পদের তথ্য গোপন করলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
এনবিআরের দাবি, এস আলম গ্রুপ, সামিটসহ যেসব করদাতা আগে আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে গেছেন, এবার তারা সবাই আইনের আওতায় আসবেন। আইন অনুযায়ী, কারও বিদেশে গোপন সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে তা নিয়ে দেশে ও বিদেশে অনুসন্ধান চালানো হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে বাজারমূল্যের সমপরিমাণ জরিমানা করা যাবে। এমনকি অভিযুক্ত বা তার প্রতিনিধির অন্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেও জরিমানা আদায় করা যাবে। এনবিআরের সদস্য (আয়কর নীতি) এ কে এম বদিউল আলম বলেন, ‘নিবাসী শব্দের সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবার জন্মসূত্রে বাংলাদেশী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এখন কেউ বিদেশে থাকলেও জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হলে তার সম্পদ রিটার্নে দেখাতে হবে। না দেখালে ২১ ধারা কার্যকর হবে।’ তিনি জানান, ১ জুলাই থেকে নতুন ধারা কার্যকর হবে। ফলে যেসব ব্যক্তি এর আগে আইন এড়িয়ে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ধারা প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।
আইনে ধারা যুক্ত হওয়ার পর প্রায় তিন বছর কেটে গেলেও বাস্তব প্রয়োগ হয়নি বললেই চলে। এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এখনো পর্যন্ত কেবল একটি অনুসন্ধান চালাতে পেরেছে। যদিও এ সময় বিভিন্ন সূত্রে বহু বাংলাদেশীর বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ার তথ্য এসেছে। সিআইসির মহাপরিচালক আহসান হাবিব বলেন, ‘২১ ধারা প্রয়োগ শুধু সিআইসি নয়, সব কর অঞ্চল করতে পারে। আমাদের সদস্যরাও কয়েকটি দেশে সম্পদ শনাক্ত করেছেন।’
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘এটা অত্যন্ত গোপনীয় বিষয়। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। বাজেট পাসের পর গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানানো হবে।’আয়কর কনসালট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘বিধানটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি তখনই কাজে আসবে, যখন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে। কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা করতে হবে। তবে যারা নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন, তাদের কাছ থেকে কীভাবে আদায় করা হবে সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।’

