আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের জোয়ারে ক্ষমতা হারানো দলটির বহু সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি), মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা এখন কারাগারে। কেউ কেউ আবার গ্রেপ্তার এড়িয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বা পালিয়ে গেছেন বিদেশে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর থেকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ১১২ জন সাবেক এমপি ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১২ জন সাবেক নারী এমপি। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—হত্যা, গুম, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার। অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা—কারও বিরুদ্ধে ৫০টির বেশি। আইজিপি বাহারুল আলম জানান, যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাঁদের ধরতে পুলিশ জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের ফিরিয়ে আনতেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
গ্রেপ্তার হওয়া সাবেকদের মধ্যে রয়েছেন-
সাবেক মন্ত্রী (২৮ জন): আনিসুল হক, দীপু মনি, আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক খান, ইমরান আহমেদ, ফরহাদ হোসেন, সাধন চন্দ্র মজুমদার, টিপু মুনশি, গাজী, আসাদুজ্জামান নূর, নূরুল ইসলাম সুজন, হুমায়ূন, নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, মোশাররফ হোসেন, আব্দুস শহীদ, মুক্তাদির চৌধুরী, লতিফ বিশ্বাস, নুরুজ্জামান আহমেদ, আমির হোসেন আমু, রাশেদ খান মেনন, ইনু, কামরুল ইসলাম, শাজাহান খান, রমেশ চন্দ্র সেনসহ অনেকে। সাবেক উপদেষ্টা (৩ জন): সালমান এফ রহমান, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।সাবেক প্রতিমন্ত্রী (১০ জন): জুনাইদ আহমেদ পলক, ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম, মাহবুব আলী, কর্নেল জাহিদ ফারুক, কামাল আহমেদ মজুমদার, জাকির হোসেন, শহীদুজ্জামান সরকার, শাহজাহান ওমর, এনামুর রহমান, দীপংকর তালুকদার।
উপমন্ত্রী (৩ জন): আরিফ খান জয়, আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু।
অন্য সাবেক এমপি (৬০+ জন): আলী আজম, হাজি মো. সেলিম, মাজহারুল ইসলাম, সেলিম আলতাফ জর্জ, ব্যারিস্টার সুমন, জান্নাত আরা হেনরী, মমতাজ বেগম, কাজিম উদ্দিন আহমেদ, জাফর আলমসহ আরও অনেকে। তাঁদের অনেককে একাধিকবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ আসামির বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
১৫ আগস্ট ঢাকার একটি আদালতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম হত্যা মামলা হয়। অভিযোগ, তাঁর সরাসরি নির্দেশে আন্দোলন দমন করতে পুলিশ গুলি চালায়। এতে ৩৮ জন নিহত ও শতাধিক আহত হন। এরপর একাধিক মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভিযোগ আনা হয়। জানা গেছে, শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।
পুলিশ জানায়, অন্তত ৬৩ জন সাবেক মন্ত্রী-এমপি এখন দেশের বাইরে। তাঁরা রয়েছেন ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের,সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল,মাহবুব উল আলম হানিফ,আবদুর রহমান,খালিদ মাহমুদ চৌধুরী,হাছান মাহমুদ।
এ পর্যন্ত গ্রেপ্তারের পর জামিন পেয়েছেন ৭ জন তাঁরা হলেন: আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, এম এ মান্নান, সাবের হোসেন চৌধুরী, রেজাউল করিম হীরা, নায়েব আলী জোয়ারদার, তাহজীব আলম সিদ্দিক, সালাহউদ্দিন মিয়াজী। সাবেক এমপি এম আব্দুল লতিফ ছিলেন প্রথম গ্রেপ্তার। র্যাব তাঁকে চট্টগ্রাম থেকে ধরে। এরপর গ্রেপ্তার হন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। তাঁদের বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা, গুম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ। আ ক ম সরওয়ার জাহান বাদশা ও ড. শামসুল আলম ছিলেন সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধে অন্তত ২০ জন সাবেক এমপি ও মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। ২৪ জুনের মধ্যে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হাজির হতে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, দেশে আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। ১১টি মামলায় তাঁকে দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাঁর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আনিসুল হকের বিরুদ্ধে রয়েছে ৫৫টির বেশি মামলা। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে ৫১ দিনের জন্য। দীপু মনির বিরুদ্ধে রয়েছে ২১টি মামলা। তাঁকে ১৯ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়।

