দেশের বীমা খাতের একের পর এক কেলেঙ্কারির পর সরকার বড় ধরনের সংস্কার আনছে। ২০১০ সালের বীমা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। নতুন খসড়া আইনে দুর্নীতি রোধ, পরিবারতন্ত্র ভাঙা এবং পলিসিধারীদের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে একাধিক কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পরিবার মিলে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার রাখতে পারবে না। ‘পরিবার’ বলতে বোঝানো হয়েছে—স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান, ভাই-বোন, জামাতা ও পুত্রবধূ। কেউ গোপনে বাড়তি শেয়ার রাখলে, তা বাজেয়াপ্ত করে কম মূল্যে বিক্রি করতে পারবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইডরা (আইডিআরএ)।
পরিচালনা পর্ষদেও আনা হচ্ছে পরিবর্তন। একই পরিবারের সর্বোচ্চ দুইজন পরিচালক হতে পারবেন। এ নিয়ম কোম্পানির গঠনতন্ত্রের ঊর্ধ্বে থাকবে। পর্ষদের সব সদস্য নিয়োগে ইডরার অনুমোদন নিতে হবে। একই ব্যক্তি একাধিক কোম্পানির পরিচালক হতে পারবেন না। পরিচালক হতে হলে কমপক্ষে ১০ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। দণ্ডিত ব্যক্তি, ঋণখেলাপি বা পূর্বে যার কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল হয়েছে তিনি আর পরিচালক হতে পারবেন না। ২০১০ সালের আইনে যে বিষয়গুলো ছিল না, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো—ব্যর্থ বা দেউলিয়া হয়ে যাওয়া বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা ফেরত দেওয়ার বিধান। এজন্য রিসিভার নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া ইডরাকে বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট অপসারণ, এমনকি নতুন প্রিমিয়াম গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসির মতো সংস্থাগুলোর কাছে এমন ক্ষমতা আগে থেকেই রয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, বীমা কোম্পানির অর্থায়নে গঠিত যে কোনো প্রতিষ্ঠান—সাবসিডিয়ারি, ফাউন্ডেশন ইত্যাদি—পরিদর্শন করতে পারবে ইডরা। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যদি গ্রাহকের স্বার্থবিরোধী মনে হয়, তখন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা জারির এখতিয়ারও থাকবে। আরও বলা হয়েছে, বীমা কোম্পানিগুলো তাদের সম্পদ বা বিনিয়োগ বন্ধক রেখে নিজেদের মালিক বা সংশ্লিষ্টদের ঋণ বা অন্য আর্থিক সুবিধা দিতে পারবে না। লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানিকে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করতে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পৃথক তহবিলে জমা রাখতে হবে। এই তহবিলের অর্থ নিরাপদ ও লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে হবে, যার আয়ও জমা হবে সেই তহবিলেই। এছাড়া বীমা এজেন্টদের কমিশন হার পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম বছর ২৫%, দ্বিতীয় বছর ১৫%, এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ৫% কমিশন নির্ধারিত হয়েছে।
দেশে বর্তমানে ৮২টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি জীবন বীমা কোম্পানি—ফারইস্ট ইসলামি, গোল্ডেন লাইফ, সানলাইফ, বাইরা লাইফ, পদ্মা ইসলামি ও সানফ্লাওয়ার লাইফ—৩৭৩৬ কোটি টাকার দাবির বিপরীতে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক পরিচালক আত্মগোপনে, কেউবা দুদকের তদন্তে গ্রেপ্তার।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম বলেন, “এই কোম্পানিগুলোর পরিচালকরা বিনিয়োগের নামে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আমরা আইন সংশোধন করছি, যাতে এই ধরনের অপকর্ম রোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়।” প্রত্যেক বীমা কোম্পানিতে সর্বোচ্চ ২০ জন পরিচালক থাকতে পারবে। এর মধ্যে অন্তত ৬ জন হতে হবে স্বতন্ত্র পরিচালক। যদি পরিচালকের সংখ্যা ২০-এর কম হয়, তবে এক-তৃতীয়াংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখতে হবে। স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ ইডরার অনুমোদিত তালিকা থেকে করতে হবে। বিদ্যমান আইনে এমন সুস্পষ্ট কোনো নিয়ম নেই।
২০২৩ সালে দেশে বীমা খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ১৮ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। মোট সম্পদ ৬৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ মানুষ কোনো না কোনো বীমা কভারেজের আওতায় রয়েছেন। ওই বছর জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে ১২,০৫১ কোটি টাকার দাবি এসেছে, পরিশোধ হয়েছে ৮,৭২৮ কোটি টাকা। নন-লাইফ বীমা কোম্পানির দাবি ছিল ৩,২১৫ কোটি, কিন্তু পরিশোধ হয়েছে মাত্র ১,১৪২ কোটি টাকা।

