বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট ছাড়াই ক্ষমতায় যাওয়ার অভিযোগ তুলে সাবেক তিন নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিএনপি। দলটির অভিযোগ, সংবিধান লঙ্ঘন করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে।
রোববার (২২ জুন) রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় এ মামলা করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং গুম-খুন সংরক্ষণ কমিটির সমন্বয়ক সালাহ উদ্দিন খান। সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা মামলার বাদী হিসেবে দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করেন, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গায়েবি মামলা, অপহরণ, গুম, খুন ও নির্যাতনের মাধ্যমে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়।
মামলায় বলা হয়, “নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্ব পালন না করে তারা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে। সরকারি কর্মচারী হয়েও নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে অবৈধভাবে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে। ভোট ছাড়াই সংসদ সদস্যদের মিথ্যা বিজয় ঘোষণা করেছে, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।” সালাহ উদ্দিন আরও বলেন, “ভোট কেন্দ্র এলাকার ভোটার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু প্রিজাইডিং-পুলিং অফিসার এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ব্যালট পেপারে থাকা সিল ও স্বাক্ষর তদন্ত করলেই প্রকৃত ভোটদানের সত্যতা বেরিয়ে আসবে।”
সকালে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল শেরেবাংলা নগর থানায় গিয়ে মামলার কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমাউল হকের কাছে হস্তান্তর করে। ওসি সাংবাদিকদের বলেন, “বাদী অভিযোগ করেছেন, বিগত তিনটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ভোট ছাড়াই প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। আমরা মামলার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।” এ সময় ওসিকে মোবাইল ফোনে মামলার বিবরণ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পড়ে শোনাতেও দেখা যায়।
এই মামলা দায়েরের এক সপ্তাহ আগেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের’ বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়, বিগত তিনটি নির্বাচন পরিচালনায় যেসব সাবেক নির্বাচন কমিশনার, সচিব জড়িত ছিলেন, তাদের ভূমিকা তদন্তে একটি কমিটি গঠিত হবে। এই সিদ্ধান্তের পরপরই বিএনপির এই আইনি উদ্যোগ এলো। এর আগে বিএনপি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে মামলার আবেদনের কপি এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাক্ষরিত চিঠি বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দিনের কাছে জমা দেয়। সালাহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা অভিযোগ দিয়েছি, এখন কমিশনের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। সিইসি আমাদের জানিয়েছেন, তিনি নিরপেক্ষ থাকবেন এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।”
বিতর্কিত তিন নির্বাচনঃ দশম সংসদ নির্বাচন (২০১৪): তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর আয়োজিত এ নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ দল অংশ নেয়নি। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। এই নির্বাচনকে বিএনপি ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’ আখ্যা দেয়। সে সময় কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ। একাদশ সংসদ নির্বাচন (২০১৮): বিএনপি অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। অধিকাংশ ভোট আগের রাতে হয়ে যায় বলে দাবি করে বিরোধীরা। মাত্র সাতটি আসনে জয় পায় বিএনপি। এই নির্বাচনকে বলা হয় ‘নীশিরাতের নির্বাচন’। কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন কেএম নূরুল হুদা। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন (২০২৪): বিএনপির বর্জনের মধ্যে নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক দেখাতে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে আসন ছেড়ে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় মূলত আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে। এই নির্বাচনকে সমালোচকরা বলেন ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচন। কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন কাজী হাবিবুল আউয়াল।।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে হাই কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আংশিক বাতিল করে রায় দেয়। এতে অবাধ নির্বাচনের সম্ভাবনা ফের জোরালো হয়। বিচারকদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “এই তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ধ্বংস হয়েছে।”এই পর্যবেক্ষণের পরই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসে, যার প্রেক্ষিতে বিএনপির পক্ষ থেকে মামলাটি দায়ের করা হলো।

