বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে ভয়-ভীতি সৃষ্টি করে ভোট ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন করার অভিযোগে বিএনপির দায়ের করা মামলায় রাষ্ট্রদ্রোহ, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছে।
দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করা তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ মোট ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে এই মামলায়। তাদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তারা আছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুজ্জোহা সরকার বুধবার দণ্ডবিধির ১২০(ক), ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় অভিযোগ জুড়ানোর আবেদন করেন। ঢাকার মহানগর হাকিম মো. মিনহাজুর রহমান শুনানি শেষে আবেদন মঞ্জুর করেন। পরে পুলিশ এসআই রফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন খান গত ২২ জুন এই মামলা করেন। মামলায় ২০১৪ সালের নির্বাচনের সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, ২০১৮ সালের সিইসি এ কে এম নূরুল হুদা এবং ২০২৪ সালের সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ তাদের সময়ের নির্বাচন কমিশনারদের আসামি করা হয়েছে। এ কে এম নূরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়ালকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও পুলিশের সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ওই তিন নির্বাচনে ভয়ভীতি ও গায়েবী মামলা, অপহরণ, গুম, খুন ও নির্যাতনের মাধ্যমে বিএনপি নেতাকর্মীদের ‘গণগ্রেপ্তার’ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
সংবিধান লঙ্ঘন, নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ, সরকারি কর্মচারী হওয়ার পরও অবৈধভাবে ভোটে হস্তক্ষেপ, ভয়-ভীতি দেখিয়ে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন এবং জনগণের ভোট না পাওয়ার পর মিথ্যা বিজয় ঘোষণা করা হলো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ভোটকেন্দ্র এলাকার ভোটার, ভোট দিতে পারেননি এমনরা, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এবং সৎ প্রিজাইডিং ও পুলিং অফিসারসহ স্থানীয়রা এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ব্যালট পেপারে থাকা সিল ও স্বাক্ষর যাচাই করলে প্রকৃত ভোটগ্রহণের সত্য উদঘাটিত হবে বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। বিএনপিসহ বেশিরভাগ দল বর্জন করায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। বিএনপি এই সংসদকে ‘বিনা ভোটের সংসদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।
- ২০১৪ সালের নির্বাচন কমিশনে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু হাফিজ, সাবেক যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাবেদ আলী ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা দায়রা জজ মো. শাহনেওয়াজ।
- ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেওয়ার পরও ব্যাপক কারচুপি ও ভোটের আগের রাতেই অধিকাংশ ভোট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনটি ‘নীশিরাতের নির্বাচন’ নামে পরিচিতি পায়। এ সময়ের কমিশনার ছিলেন কেএম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।
- ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বর্জন করে। জাতীয় পার্টি অংশ নিলে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এ নির্বাচনের নাম হয় ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচন। এই নির্বাচনেও কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্ব দেন।
এই তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং ১৫ বছর ধরে দেশের শাসন পরিচালনা করে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। গত বছর ডিসেম্বরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আংশিক বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার পথ তৈরি করে। আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে, এই তিন নির্বাচনে ‘অবাধ ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয়নি’ এবং ‘জনগণের আস্থা নষ্ট হয়েছে’।
এরপর ১৬ জুন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সরকারপ্রধানের দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বিতর্কিত তিন নির্বাচনের তদন্তের জন্য সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা পরীক্ষা করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে।

