বাংলাদেশে এখন থানায় কোনো মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দেয় যদি অপরাধের প্রমাণ মেলে। আর প্রমাণ না পেলে জমা পড়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন। তবে দুটি প্রতিবেদনই আসে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর।
এ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। নতুন করে ভাবা হচ্ছে তদন্ত চলাকালে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়ার নিয়ম চালুর বিষয়টি। স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের একাধিক পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি এগোনো হচ্ছে।
বর্তমান আইনে (ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা) নির্ধারিত কোনো সময়সীমা নেই তদন্ত শেষ করার। এতে অনেক সময় মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এই বিলম্বে নিরপরাধ ব্যক্তিরা হয়রানির শিকার হন। নতুন ব্যবস্থায় তদন্ত চলাকালেই যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রমাণ মেলে না, তাহলে পুলিশ আদালতে সেটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানাতে পারবে। এতে অভিযুক্ত ব্যক্তি আগেভাগেই অব্যাহতি পেতে পারেন।
- তদন্ত তদারক কর্মকর্তা (যেমন পুলিশ কমিশনার বা এসপি) সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারবেন।
- প্রতিবেদনে অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা বা নির্দোষ প্রমাণের তথ্য পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকবে।
- অভিযুক্ত নির্দোষ হলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করে অব্যাহতি দেওয়া যাবে।
- অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলবে স্বাভাবিক গতিতে।
যেসব বিষয় সংশোধন আসতে পারে:
- ৫৪ ধারা সংশোধন: বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার বা তল্লাশি হলে রসিদ দেওয়ার নিয়ম চালু হতে পারে।
- মেডিকেল পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা: গ্রেপ্তারের পর বাধ্যতামূলক মেডিকেল চেকআপ চালুর চিন্তা।
- ঘটনাস্থলে সাক্ষী রাখার প্রস্তাব: তবে এটি বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
- পুলিশি বাণিজ্য ঠেকাতে নজরদারি: তদন্তে দুর্নীতি ঠেকাতে উচ্চপর্যায়ের মনিটরিংয়ের সুপারিশ।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, “নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি থেকে বাঁচাতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন চালুর চিন্তা এসেছে। এটি কার্যকর হলে অনেক ভোগান্তি কমবে।”
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, “আইন মন্ত্রণালয় তিনটি বিষয় সামনে রেখে সংস্কারে এগোচ্ছে— স্বল্প খরচে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি, ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং মামলা থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়া।” তিনি জানান, আইন সংশোধনের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে, এবং মাসখানেকের মধ্যেই অধ্যাদেশ আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, “মিথ্যা মামলা ও হয়রানি থেকে মুক্তির জন্য অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ভালো উদ্যোগ। তবে পুলিশের বাণিজ্যের নতুন পথ যেন না খুলে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “তদন্তে পুলিশের বাণিজ্যের বহু উদাহরণ আছে। তাই থানায় এই ক্ষমতা না দিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদারকি থাকা উচিত।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ব্যবস্থায় প্রভাবশালীদের চাপে কিংবা ঘুষের বিনিময়ে প্রকৃত অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ রাখতে হবে। পাশাপাশি থাকতে হবে কার্যকর উচ্চপর্যায়ের নজরদারি। অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন চালু হলে তা বিচার ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়নের শর্ত হচ্ছে— স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো।

