ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া পাঁচ হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব লাইসেন্সের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক ব্যবসায়ীদের নামে। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে জমা পড়া ও না পড়া অস্ত্রের কাগজ যাচাই করে নানা অসংগতি পাওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্ধারিত সময় পার হলেও এখনো ৭ হাজারের বেশি অস্ত্র জমা পড়েনি। অস্ত্রধারীদের খুঁজে পেতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ খালি হাতে ফিরেছে। অনেকেই আত্মগোপনে গেছেন, কেউ কেউ দেশ ছেড়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব খন্দকার মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘‘লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।’’ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) তথ্য বলছে, দেশে মোট বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স আছে ৪৯ হাজার ৬৭১টি। এর মধ্যে ব্যক্তির নামে সাড়ে ৪৬ হাজার এবং বাকিগুলো প্রতিষ্ঠানের নামে।
ব্যক্তিগত লাইসেন্সধারীদের মধ্যে:
- আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নামে আছে অন্তত ৮ হাজার ২০০টি
- বিএনপির নামে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি
- অন্যান্য দলের নামে মাত্র ৭৯টি
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি লাইসেন্স ঢাকা বিভাগে (১৪,৬৮৩টি), সবচেয়ে কম ময়মনসিংহে (২,১১৮টি)। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব লাইসেন্সধারীকে অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বলা হয়, নির্ধারিত সময় পার হলে লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের ৯ মাস পরও জমা হয়নি ৭ হাজারের বেশি অস্ত্র। জমাকৃত এবং জমা না দেওয়া উভয় ক্ষেত্রেই কাগজপত্র যাচাই করে ৫ হাজারের বেশি লাইসেন্স বাতিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যারা অস্ত্র জমা দিয়েছেন, তাঁদের কাগজপত্রেও নানা অসংগতি পাওয়া গেছে। আর যারা জমা দেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে।”
এসবি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে দলীয় বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাও এই সুযোগে লাইসেন্স নেন। কেউ কেউ এই অস্ত্র বিরোধীদের ভয় দেখাতে ব্যবহার করেন। অনেকে অবৈধ অস্ত্র বৈধ বলে চালিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগেও লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের কারণে অনেকের লাইসেন্স বাতিল হলেও আওয়ামী নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে তা হয়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের এক থানা সূত্র জানায়, অস্ত্র জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ তাঁদের বাড়িতে গেলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাউকে পায়নি। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে গাজীপুর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইলসহ একাধিক জেলার থানা।
তালিকায় থাকা কয়েকজনের নাম:
- আনোয়ারুল কবির – ঢাকা হাতিরঝিল-রমনা থানা আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক
- ইকবাল হোসেন তিতু – ডিএনসিসির সাবেক কাউন্সিলর
- নুনু মিয়া – সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা
- মো. মোখলেছুর রহমান কামরান – সিলেট মহানগর আ.লীগ নেতা
- সাইফুজ্জামান সোহেল – টাঙ্গাইল জেলা আ.লীগ
- সেলিম হাসান – ফরিদপুর স্বেচ্ছাসেবক লীগ
- জাহিদুর ইসলাম সুজন – পূর্বধলা উপজেলা চেয়ারম্যান, তাঁদের কেউ অস্ত্র জমা দেননি।
কুষ্টিয়ায় ২০১০, ২০১২ ও ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ ২৬২টি লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্সধারীদের অধিকাংশ স্থানীয় আ.লীগ নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী। বেশিরভাগ অস্ত্র জমা পড়েনি। কুষ্টিয়ার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান নিজের অস্ত্র জমা দেননি। তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের চাচাতো ভাই। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, “যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা দেননি, তাঁদের অস্ত্র এখন অবৈধ। এগুলো উদ্ধার করাই আমাদের দায়িত্ব।”
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “রাজনৈতিক প্রভাবে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অস্ত্র প্রদর্শন এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। এ থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।” তিনি বলেন, “যারা অস্ত্র জমা দেননি বা ভুয়া তথ্য দিয়ে লাইসেন্স নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। না হলে অস্ত্রের অপব্যবহার বাড়বে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।”

