সরকার সম্প্রতি ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ সংশোধন করে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে অধ্যাদেশ আকারে কার্যকর করেছে। লক্ষ্য—বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মামলাজট হ্রাস এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারের প্রসার। তবে এই সংশোধনী নিয়ে আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
নতুন আইনে নির্ধারিত হয়েছে—পারিবারিক মামলা, পাঁচ লাখ টাকার কম মূল্যের চেক ডিজঅনার, যৌতুক প্রতিরোধ আইনের ৩ ও ৪ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারার মামলা আদালতে দায়েরের আগে বাধ্যতামূলকভাবে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (Alternative Dispute Resolution- ADR) করতে হবে।
তালাক, যৌতুক বা মনোমালিন্যের মতো সমস্যাগুলো আদালতের বাইরে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান সম্ভব হবে। এতে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হবে, মামলার সংখ্যা কমবে। বর্তমানে দেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। বাধ্যতামূলক ADR- এর ফলে অনেক মামলাই আদালত পর্যন্ত যাবে না, ফলে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়বে। আইনগত সহায়তার সুযোগ পেয়ে দরিদ্র মানুষ বিনা খরচে আইনি পরামর্শ ও মধ্যস্থতার সুবিধা পাবেন।
এ ধরনের বিকল্প নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া একটি নতুন আইন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, যেখানে ছোটখাটো আর্থিক ও পারিবারিক বিরোধ মামলা ছাড়াই মীমাংসা সম্ভব। যৌতুক প্রতিরোধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলো ফৌজদারি অপরাধ হলেও সেখানে বাধ্যতামূলক ADR চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে তীব্র আপত্তি উঠেছে। ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারেন, অভিযুক্তরা প্রভাব খাটিয়ে আপস বাধ্য করতে পারে।
৫ লাখ টাকার নিচের চেক প্রতারণার মামলাও বাধ্যতামূলক ADR এর আওতায় এসেছে। এতে প্রতারিত ব্যক্তি প্রতিকার পেতে দেরি করতে পারেন, অনেকে এটিকে অপরাধীদের জন্য সময়ক্ষেপণ কৌশল বলেও উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় গ্রাম বা প্রান্তিক এলাকায় ADR প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা থেকেই যায়।
কোনো ফৌজদারি মামলায় ভিকটিমের সম্মতি ছাড়া ADR বাধ্যতামূলক করা হলে তা ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াবে। এতে ভিকটিমের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। লিগ্যাল এইড আইন সংশোধন নিঃসন্দেহে ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারের প্রসার এবং মামলাজট নিরসনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বিশেষ করে পারিবারিক ও ছোটখাটো আর্থিক বিষয়ে এটি বাস্তবিকই কার্যকর হতে পারে।
তবে অপরাধমূলক মামলায়, বিশেষ করে নারী নির্যাতন বা আর্থিক প্রতারণার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বাধ্যতামূলক ADR প্রক্রিয়া ভিকটিমদের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং অপরাধীদের জন্য আইনি ফাঁক খুলে দিতে পারে। এই কারণে সংশোধিত আইনের যথাযথ বাস্তবায়নে প্রয়োজন একটি মানবাধিকার সংবেদনশীল, স্বচ্ছ ও স্পষ্ট নির্দেশনাভিত্তিক নীতিমালা। ফৌজদারি মামলায় ADR বাধ্যতামূলক করার আগে অবশ্যই ভিকটিমের সম্মতি নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। সর্বোপরি লক্ষ্য হওয়া উচিত—ন্যায়বিচার হোক সহজলভ্য, তবে কখনোই যেন তা ভীতিকর, বিলম্বিত বা ভিকটিম-বান্ধবহীন না হয়।

